ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন
* উত্তরে তাবিথ আউয়াল, মিল্টন, কাইয়ুমসহ একাধিক নাম আলোচনায়
* দক্ষিণে ইশরাক, সোহেল ও আব্দুস সালামকে ঘিরে হিসাব-নিকাশ
* জয়ের সম্ভাবনা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তিই প্রার্থী বাছাইয়ের মূল মাপকাঠি
* জামায়াত-এনসিপির প্রার্থী সমীকরণে বাড়ছে বিএনপির হিসাবের চাপ
* মনোনয়ন না পাওয়া পার্লামেন্ট ইলেকশনের প্রার্থীর অনেকে টিকেট চাইছেন
* তফশিলের আগে মনোনয়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বিএনপির
রাজধানীর একটি ওয়ার্ডে সন্ধ্যার পরও চলছে সামাজিক অনুষ্ঠান। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বসে স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন বিএনপির এক নেতা। কিছুক্ষণ পরেই সেখানে হাজির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী। দুই জনের লক্ষ্য এক, দলীয় হাই কমান্ডের নজরে থাকা এবং ঢাকা শহরবাসীর কাছে নিজের অবস্থান জানান দেয়া। ঢাকার দুই সিটি কর্পরেশন নির্বাচন সামনে রেখে এমন দৃশ্য এখন অনেক এলাকাতেই চোখে পড়ছে। পোস্টার-ব্যানার, সামাজিক অনুষ্ঠান, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক আর হাই কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ— সব মিলিয়ে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে।
তবে মাঠের এই তৎপরতার চেয়েও বড় সমীকরণ এখন বিএনপির হাই কমান্ডে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পরেশনে কাকে মেয়র প্রার্থী করা হবে, এ সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও নির্বাচনী মাঠে জয়ের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে দলটি। এখনো কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে ভেতরে ভেতরে চলছে বিস্তর হিসাব-নিকাশ।
রাজধানীর দুই সিটি কর্পরেশন বিএনপির কাছে অন্য যে কোনো স্থানীয় সরকারের চেয়ে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র ঢাকা। ফলে দুই সিটিতে জয় শুধু মেয়র পদ দখলের হিসাব নয়, রাজধানীর রাজনীতিতে দলের শক্তি প্রদর্শনেরও বড় সুযোগ। এ কারণে প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো ভুল করতে চাইছে না বিএনপি।
দলীয় সূত্র বলছে, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সাংগঠনিক দক্ষতা, ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মোকাবিলার সক্ষমতা, সবকিছু বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিতর্কিত কোনো নেতাকে মনোনয়ন না দেয়ার বিষয়টি হাই কমান্ডের বিবেচনায় রয়েছে। জয়ী হয়ে আসতে পারেন, এমন প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত অগ্রাধিকার পাবেন।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, পার্লামেন্ট ইলেকশনে মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের একটি অংশ এবার সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার পার্লামেন্ট ইলেকশনে মনোনয়ন পেলেও জয়ী হতে পারেননি— এমন নেতারাও মেয়র পদে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরছেন। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি অনেকে নিজেদের এলাকায় আগেভাগেই জন সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বড় একটি দলে সিটি নির্বাচনে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকাটা স্বাভাবিক। ঢাকার দুই সিটিতে এখনো কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে হাই কমান্ড খোজখবর নিচ্ছে। তফশিল ঘোষণার পরই দলীয় মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও বসে নেই। জামায়াতে ইসলামী ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। উত্তরে মহানগর আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের নাম সামনে রয়েছে। দক্ষিণে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার বিষয়টি দলটি প্রায় চূড়ান্ত করেছে বলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।
আবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আগেই দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রার্থীদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন ঘিরে নতুন সমীকরণও তৈরি হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিজের ভোটার তালিকা দক্ষিণ থেকে উত্তরে স্থানান্তর করেন। একই সময়ে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী উত্তর থেকে দক্ষিণে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেন। ফলে দুই সিটিতে এনসিপির সম্ভাব্য নির্বাচনী সমীকরণও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থী শুধু দলীয় ভোটের ওপর নির্ভর করবেন না; নগরীর তরুণ, নতুন ভোটার এবং দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা ভোটারদের আকৃষ্ট করার সক্ষমতাও নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
উত্তরে তাবিথকে ঘিরে আগ্রহ
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন তাবিথ আউয়াল। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, উত্তর ঢাকায় পরিচিতি এবং দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে এবারো তার নাম সামনে রয়েছে। তাবিথ নিজেও জানিয়েছেন, দলীয় হাই কমান্ড মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত।
তবে উত্তরের লড়াই শুধু তাবিথকে ঘিরে আটকে নেই। বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মিল্টন ত্রয়োদশ পার্লামেন্ট ইলেকশনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। প্রশাসক হিসেবে সিটি কর্পরেশনের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে নগর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও তার একটি বাড়তি দিক।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক ড. এম এ কাইয়ুমের নামও রয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায়। দীর্ঘদিনের নগর রাজনীতি, সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং উত্তর ঢাকায় সাংগঠনিক যোগাযোগকে তার পক্ষে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন নেতা-কর্মীদের একটি অংশ।
এর বাইরে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসানের নামও তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মামলা, গ্রেফতার ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠে সক্রিয় থাকার কারণে দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ তার প্রতি আস্থাশীল। পার্লামেন্ট ইলেকশনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় সিটি নির্বাচনে তাকে বিবেচনা করা হতে পারে, এমন আলোচনা রয়েছে। ফলে উত্তরে বিএনপির সামনে মূল প্রশ্ন— পরিচিত ও পরীক্ষিত তাবিথ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মিল্টন, না-কি দীর্ঘদিনের নগর রাজনীতির নেতা এম এ কাইয়ুম বা অন্য কোনো মুখ? শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে যেতে পারে বলেও মনে করছেন দলটির নেতারা।
দক্ষিণে ইশরাক-সোহেল-সালাম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পরেশনেও বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা কম নয়। এখানে সবচেয়ে আলোচিত নাম ইশরাক হোসেন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও আব্দুস সালাম।
ইশরাক হোসেনের প্রার্থিতার বিষয়টি অন্যদের তুলনায় স্পষ্ট। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজেই ঘোষণা দেন, ঢাকা দক্ষিণ থেকে সিটি কর্পরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন। পরে ত্রয়োদশ পার্লামেন্ট ইলেকশনে ঢাকা-৬ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ফলে দক্ষিণ ঢাকার ভোটারদের কাছে তার পরিচিতি রয়েছে।
আবার হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজপথের নেতা হিসেবে পরিচিত। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্বে থাকা এই নেতা দলের আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে সামনে থেকে ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত হওয়া, গ্রেফতার ও রিমান্ডের মুখোমুখি হয়েও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে তৃণমূলের একটি অংশে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সিটি নির্বাচনে তাকেও শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন অনেকে। সাম্প্রতিক আলোচনাতেও দক্ষিণে তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।
ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালামের নামও রয়েছে আলোচনায়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং নগর রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রেখেছে। পার্লামেন্ট ইলেকশনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও দলীয় হাই কমান্ডের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে এনেছে। তিনি নিজেও জানিয়েছেন, দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করতে প্রস্তুত।
দক্ষিণে তাই বিএনপির সমীকরণ আরো জটিল। ইশরাকের রয়েছে আগের সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি; সোহেলের রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ও আন্দোলনের ভূমিকা; আব্দুস সালামের রয়েছে নগর প্রশাসন ও দলীয় সংগঠনের অভিজ্ঞতা। তিন জনের শক্তির জায়গা তিন রকম। ফলে হাই কমান্ড কাকে বেছে নেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, যোগ্য ব্যক্তিকেই প্রার্থী করবে বিএনপি। আগামী দিনে তরুণ ও মধ্যবয়সী নেতারা বেশি গুরুত্ব পাবেন। সিটি নির্বাচন বিএনপি গুরুত্বের সঙ্গেই করবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পার্লামেন্ট ইলেকশনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির সামনে নতুন ধরনের পরীক্ষা। পার্লামেন্ট ইলেকশনের ভোটের হিসাব আর সিটি নির্বাচনের ভোটের হিসাব এক নয়। ওয়ার্ড ভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় ইসু, প্রার্থীর নাগরিক ভাবমূর্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে ভোটের বিভাজন— সবকিছুই ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। আর সেই কারণেই ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাই এখন কেবল মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড় নয়; এটি হয়ে উঠেছে দলের রাজনৈতিক কৌশলেরও পরীক্ষা। হাই কমান্ড এমন প্রার্থীই খুজছে, যিনি শুধু দলের প্রতীক নিয়ে মাঠে নামবেন না, ভোটারের দরজায় গিয়ে নগরীর সমস্যা, নাগরিক ভোগান্তি ও ভবিষ্যৎ ঢাকার একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখাও তুলে ধরতে পারবেন।
তফশিল ঘোষণার আগে পর্যন্ত তাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাপ চলবে। শেষ মুহূর্তে কার নাম বাদ পড়ে, কার নাম উঠে আসে, আর কোন সমীকরণে উত্তর ও দক্ষিণের প্রার্থী ঠিক হয়, রাজধানীর রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল সেখানেই।