সংগৃহীত ছবিনিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল সর্বোচ্চ ৩০ বছর। নির্দিষ্ট কিছু কোটায় সর্বোচ্চ ৩২ বছর। বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল পদভেদে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা। অথচ সেই শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত পেশাগত সনদ ও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিভিন্ন পদে প্রার্থী নিয়োগ, প্রার্থীদের সার্টিফিকেট যথাযথভাবে যাচাই না করা এবং কয়েকটি পদে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। ঘটনাটি ২০২৩ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে হস্তান্তরিত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগকে ঘিরে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে থাকা শর্তগুলো আদৌ কতটা অনুসরণ করা হয়েছিল এবং নিয়োগের আগে প্রার্থীদের বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত সনদ যথাযথভাবে যাচাই না করেই নিয়োগ দিয়েছে তৎকালীন কমিটির সভাপতি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা, সদস্য-সচিব ও বান্দরবান পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কাউছার এবং নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আল মামুন।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের রাজস্ব খাতভুক্ত ১১-২০ গ্রেডের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে শুধু বান্দরবান পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের কাছ থেকে আবেদন আহŸান করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে মোট ১৩টি পদে ৭৩টি শূন্য পদে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়। পদভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও অভিজ্ঞতার শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শুধু পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বা মেধাতালিকায় স্থান পাওয়াই যথেষ্ট ছিল না। প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হতো।
২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখার উপসচিব দীপংকর বিশ্বাসের স্বাক্ষরিত একটি স্মারক দেখা যায়, তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সাধারণ ও রাজস্ব প্রশাসনের তৃতীয় শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগে বয়সসীমা শিথিলসংক্রান্ত ১৯৮৫ ও ১৯৯৩ সালের দুটি সরকারি আদেশ আর কার্যকর নেই।
স্মারকে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়, সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ এবং ২০১৩ সালের সংশ্লিষ্ট আইনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জানুয়ারি ১৯৮৫ সালের গঊ/জ১/-ঝ-১৩/৮৪ (চও-১)-২০(৭৫) নম্বর স্মারকের বৈধতা নেই। একইভাবে ওই আদেশের ভিত্তিতে জারি করা ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালের সম/বিধি-১/এস-২২/৯৩-২৫৯(৫০০) নম্বর আদেশটিও অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। উল্লিখিত দুটি আদেশ বৈধতা হারিয়েছে এবং বর্তমানে কার্যকর নয়।
আবেদনের শর্ত ও নিয়মাবলী অনুযায়ী, ৪ নম্বর শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখের ০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭.২০-১৫৪ নম্বর স্মারকের পরিপত্র অনুসরণের কথা বলা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ১৭ আগস্ট ২০২৩ তারিখে সাধারণ প্রার্থীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পোষ্যদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই শর্তের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ভাবে দেওয়া হয়েছে নিয়োগ।
জেলা পরিষদের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ২০২৩ সালের নিয়োগটি ব্যপক অনিয়ম করা হয়েছে। আপনি এখন সেই নিয়োগের কোন ফাইল জেলা পরিষদের পাবেন না। তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক দীপক কুমার সাহা, তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কাউছার এবং নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আল মামুনদের যেমন মন চায় তেমন ভাবে নিয়োগ দিয়েছে। এমন কি এই নিয়োগের মন্ত্রণালয়ের কোন ছাড়পত্র ছিলো না।
জেলা পরিষদের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা কম্পিউটার অপারেটর প্রিয়ম দাশ বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়োগসংক্রান্ত কোনো ফাইল পাইনি। নিয়োগের সময় কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র খুঁজে দেখা হলে তখন বিস্তারিত জানা যাবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখ বান্দরবান জেলা পরিষদ একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তিন মাস পর নভেম্বরে ২০ তারিখ লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এর তিনদিন পর মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার পর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের ফলাফল প্রকাশ হয়। এছাড়াও সাধারণ প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৩০ বছর নির্ধরিত করা থাকলেও চূড়ান্ত নিয়োগ পাওয়া র্প্রাথীদের বয়স ছিলো বেশি। যায় মধ্য পরিবার কল্যাণ সহকারী পদে রুয়াত জিং ময় বমেকে ৩৯ বছরে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া অংছিং ওয়ানকে ৩৭ বছর, নাজমা খাতুনকে ৩৪ বছর, ৩৩ বছরে মেনুছিং মারমাসহ আরো অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগ পাওয়া পরিবার কল্যান সহকারী নাজমা খাতুন বলেন, জেলা পরিষদ নিয়োগ দিয়েছে সেই সময় ৩৯ বছরে নিয়োগ দিয়েছে, আমার তো ৩৪ ছিলো। এছাড়াও কথা হয় একাদিক নিয়োগ প্রার্থীদের সাথে তারা টাকা দেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে কিনা জানি না, তবে একাদিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো যারা লিখত পরিক্ষায় পাস করতে পারে নাই।
এছাড়াও, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদ নিয়ে। বিজ্ঞপ্তিতে এ পদের জন্য নির্দিষ্ট পেশাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসএসসি পাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (গঅঞঝ) থেকে চিকিৎসা সহকারীদের জন্য নির্ধারিত কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স পাস করার শর্ত ছিল। বিজ্ঞপ্তিতে ফার্মাসিস্টের দুটি শূন্য পদ পূরণের জন্যও নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের নিবন্ধনসহ তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স পাসের শর্ত ছিল। শুধু চিকিৎসা সহকারী ও ফার্মাসিস্ট পদ নয়, অন্যান্য পদেও নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ছয়টি পদে এইচএসসি পাসের পাশাপাশি কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকার শর্ত ছিল। আবার আরও কয়েকটি পদে বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের সনদপত্র/কোর্স সম্পন্ন করার যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাঃ আবুল মনসুর বলেন, তৎকালীন সময়ে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। নিয়োগের সময় সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা ও বিধি-বিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অনিয়ম বা বিধিবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি কীভাবে হয়েছে, তা এখনো জানি না। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।