বৃহস্পতিবার উত্তর ফ্রান্সের লিল শহরে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শিক্ষার্থীরা সময়সূচি, ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শিক্ষকস্বল্পতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে স্কুলগুলোর বাইরে বিক্ষোভ করে আসছে। ছবি: গেটি ইমেজেসশিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে ফ্রান্সে স্কুলশিক্ষার্থীদের শুরু করা বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দেশজুড়ে বড় ধরনের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে গেলে কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ১৯০ জন শিক্ষার্থী আহত এবং পাচ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সোমবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসের একটি স্কুলের কাছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাকে কাছের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁর আঘাত জীবনসংহারী নয়।
এর আগে গত সপ্তাহে সাঁ-ওয়াঁ-লো-মোন এলাকায় ১৪ বছর বয়সী এদেন গুরুতর আহত হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাঁদানে গ্যাসের একটি গ্রেনেড তার মাথায় আঘাত করে। এদেনের আইনজীবী জানিয়েছেন, তার চোয়ালের দুটি হাড় ভেঙে গেছে এবং তাকে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে।
এদেনের মা সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তার হৃদয় ‘ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে’। ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভি তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তিনি ঘটনাটিকে ‘লজ্জাজনক, ভয়াবহ, সহিংস এবং আতঙ্কজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, পড়াশোনার জন্য ভালো পরিবেশের দাবি জানানো শিশুদের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নো রোববার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একগুচ্ছ পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। স্কুলগুলোতে ‘দৃশ্যমান পরিবর্তন’ আনার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তবে বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান আয়োজক ইউনিয়ন সঁদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) বলেছে, সরকার ‘কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি’। মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, ‘এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন’-এর প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আরও কয়েকটি সংগঠন সমর্থন জানিয়েছে। শিক্ষকদের ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউ তাদের সদস্যদের মঙ্গলবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই)-এর নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এই বিক্ষোভকে ১৯৬৮ সালের পর ‘হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে শক্তিশালী যুব আন্দোলন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল এবং ওই সময় লাখ লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে গিয়েছিলেন।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলেও পরে তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার সমস্যার সমাধান।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নো একই সঙ্গে বলেছেন, ‘সহিংসতার ব্যাপারে আমরা কোনো ছাড় দেব না।’ হামলার শিকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের পাশাপাশি আহত পুলিশ কর্মকর্তা ও জেনদার্মদের পাশে সরকার রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধের পাশাপাশি ময়লার বিনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ২৪টি স্কুলে ‘আগুন দেওয়া ও ভাঙচুর’ করা হয়েছে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে পাচ হাজার ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের ৮৭ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জনকে বিচার-পূর্ব আটক রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ৮০২ জনের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ৩১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং এক হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ করেছে ইউএসএল। গত সপ্তাহে এ অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, বিক্ষোভগুলোতে পুলিশ ‘অত্যন্ত মাত্রাসম্মতভাবে’ দায়িত্ব পালন করেছে।
ফ্রান্সের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কয়েক মাস পর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং তা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সরকার ও কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকেরা বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য কট্টর বামপন্থীদের দায়ী করেছেন। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নো বলেন, আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়ে লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই) ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আচরণ করছে।
কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন ল্য পেনও বিক্ষোভ নিয়ে বামপন্থীদের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, ‘এটি আর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পেশাদারদের সংগঠিত দাঙ্গায় পরিণত হয়েছে, যার তদারকিতে রয়েছেন লা ফ্রঁস ইনসুমিজের আইনপ্রণেতারা।’ তিনি নতুন করে দাঙ্গাবিরোধী আইন পাসের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে এলএফআইয়ের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ পুলিশকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের’ জন্য দায়ী করেছেন। ‘তরুণদের বিক্ষোভ রক্ষা করতে’ জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
বামপন্থী মেয়র বেনোয়া পায়াঁ মার্সেই শহরে সংঘটিত ‘অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ ও সরকারি সেবা নিয়ে ‘যথার্থভাবেই উদ্বিগ্ন’। তবে তাঁদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে হবে।