বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভ । ছবি: হাইম গোল্ডবার্গ/ফ্ল্যাশ৯০ইসরায়েলিদের মধ্যকার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কারণে দেশটি অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও গৃহযুদ্ধের ঝুকিতে রয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ‘রেড সেল’ নামে পরিচিত একটি ইউনিটের তৈরি ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ড্রপসাইট নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইদিন’ নামের প্রতিবেদনটি গত সোমবার প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে ইসরায়েলের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনে প্রধান মন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ধরে রাখার জন্য লড়াই করবেন।
প্রতিবেদনের আরও বলা হয়েছে ইসরায়েলের অন্যতম বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের দীর্ঘদিনের ছাড়ের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, এ বিরোধ নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের ভেতরের গভীর বিভাজন প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহু তার দুই আল্ট্রা-অর্থোডক্স রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন কি না। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধান মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দল দুটি নেতানিয়াহুর গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে রয়েছে।
ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় কয়েক লাখ রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করা হলেও আল্ট্রা-অর্থোডক্স পুরুষেরা ঐতিহাসিকভাবে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে ছাড় পেয়ে আসছেন। এর ফলে তারা পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইয়েশিভায় ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর সামরিক সেবার এই ছাড় বাতিলের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইন পাস করতে নেতানিয়াহুর জোট বারবার ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে কয়েক ডজন তরুণকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যাতে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে এমন একটি পরিস্থিতিরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যেখানে ১০ হাজারের বেশি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সাবেক সেনা বেসামরিক জীবনে ফিরে এসে সমাজের সঙ্গে পুনরায় খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলের রিজার্ভ সেনারা নিজেদের অস্ত্র বাড়িতে রাখার অনুমতি পান। দেশটিতে জনসমক্ষে অ্যাসল্ট রাইফেল বহন করাও সাধারণ ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলে অস্থিতিশীলতা তৈরির আরেকটি কারণ হিসেবে দখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি, খাদ্যের মূল্যস্ফীতি এবং সামরিক ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধির বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ড্রপসাইট নিউজ জানিয়েছে, সিআইএর এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটির রেড সেল। এটি সিআইএর ভেতরের একটি আধা-স্বাধীন ইউনিট, যার কাজ প্রচলিত ধারণার বিপরীত মত তুলে ধরা এবং প্রতিষ্ঠিত অনুমান ও পক্ষপাতকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রতিবেদনটিতে নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে তৈরি হওয়া বিভিন্ন চাপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের লেখকদের ধারণা, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন থেকে স্পষ্ট কোনো ফলাফল নাও আসতে পারে। ইসরায়েলের বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু অথবা তার বিরোধী রাজনৈতিক জোট, কোনোটিই পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার পর্যায়ে নাও পৌছাতে পারে। এসব চাপ কীভাবে শেষ পর্যন্ত গৃহসংঘাতে রূপ নিতে পারে, প্রতিবেদনে সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতির মাধ্যমে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতি হিসেবে বলা হয়েছে, বিদেশি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে বিনিয়োগ ও নিয়োগ কমিয়ে দিলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে আগ্রহ হারানো অথবা বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় না রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে মূলত ইসরায়েলিদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যকার উত্তেজনা ও বিভাজনকে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
শুক্রবার ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা একজন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাড়ান। ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট তাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।
তবে একই আদালত ইসরায়েলি নাগরিক ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী আরও চারটি রাজনৈতিক দলের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে।