মো. শফিউল্লাহ , নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
সংগৃহীত ছবিবিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর জীবন মানেই ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ও ভবিষ্যৎ গড়ার নিরন্তর প্রস্তুতি। এর পাশাপাশি যখন কাঁধে ওঠে সাংবাদিকতার দায়িত্ব, তখন সেই পথচলা হয়ে ওঠে আরও চ্যালেঞ্জিং। কখনো ক্লাস শেষে সংবাদ সংগ্রহে ছুটে চলা, কখনো গভীর রাত পর্যন্ত সংবাদ লেখা কিংবা তথ্যের সত্যতা যাচাই। সবকিছুর আড়ালে থেকে যায় ব্যক্তিগত সময়, পরিবারের সান্নিধ্য আর নিজের যত্ন নেওয়ার সুযোগ। তবু তাঁরা থেমে থাকেন না। কারণ, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা তাঁদের কাছে কেবল একটি পরিচয় নয়; এটি সত্য তুলে ধরা, মানুষের কথা বলা এবং নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়িত্ব পালনের এক নিরন্তর অঙ্গীকার। এমনই শ্রম, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (নোবিপ্রবিসাস) পেরিয়ে এসেছে এক যুগের পথচলা।
সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং ও স্বতন্ত্র পেশা। জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি ভালোবাসা ও নেশার টানে যারা এই পেশায় যুক্ত হন, তাঁদেরও প্রায়ই সময়ের অভাবে আক্ষেপ করতে হয়। সেখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। একদিকে একাডেমিক ব্যস্ততা, অন্যদিকে সংবাদ সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন তৈরির চাপ৷ সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
এই ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় নিজের যত্ন নেওয়া হয়ে ওঠে না, কাছের মানুষদেরও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত আনন্দ ও অবসরের মুহূর্তগুলো বিসর্জন দিতে হয় দায়িত্বের কাছে। বিনিময়ে সব সময় মেলে না আর্থিক সুবিধা কিংবা প্রত্যাশিত স্বীকৃতি। কখনো কখনো সহ্য করতে হয় সমালোচনা ও ভুল বোঝাবুঝিও। তবু তাঁরা কাজ করে যান, কারণ একটি সংবাদ মানুষের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখতে পারে, অনিয়মের চিত্র সামনে আনতে পারে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অর্জনকে দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে পারে। এই দায়বদ্ধতাই তাঁদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।
অবশ্য সাংবাদিকতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতারই অংশ। তবে বিচ্ছিন্ন ভুলত্রুটির কারণে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সামগ্রিক অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং তাঁদের কাজের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির পথচলা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন, অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধান এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আগামী ১১ অক্টোবর সংগঠনটি পূর্ণ করতে যাচ্ছে তার পথচলার এক যুগ।
এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংকট, সম্ভাবনা, অর্জন ও সমস্যাকে জনসমক্ষে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সংগঠনটি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, একাডেমিক পরিবেশ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় উঠে এসেছে এর সদস্যদের লেখনীতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো আলোচনায় আনার ক্ষেত্রেও ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। আর জুলাই আন্দোলনের অবদান অবিস্মরণীয় করেছে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতাকে।
দীর্ঘ পথচলায় নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ক্যাম্পাসের বাইরের অনেক মানুষের কাছেও পরিচিত একটি নাম হয়ে উঠেছে। এই পরিচিতি যেমন সংগঠনটির অর্জন, তেমনি তা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যাশাও বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটি সাংবাদিক সংগঠনের সাফল্য শুধু প্রকাশিত সংবাদের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বস্তুনিষ্ঠতা, তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত সততা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতাই একটি সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি। তাই নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির এক যুগের পথচলা অতীতের অর্জন স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের দায়িত্ব নির্ধারণেরও উপলক্ষ। সংগঠনটির সামনে প্রত্যাশা থাকবে, সত্যনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দক্ষতা ও পেশাগত নৈতিকতা বিকাশেও ভূমিকা রাখবে।
নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির এক যুগ পূর্তি তাই কেবল একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; এটি এর সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করার উপলক্ষ। যাঁরা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনটির সঙ্গে ছিলেন, বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের সবার অবদান এই পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার ধরন ও চ্যালেঞ্জ বদলাবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমেও আসবে পরিবর্তন। তবে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং জনস্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার যেন অটুট থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি আরও পেশাদার, বস্তুনিষ্ঠ ও জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতার পথে এগিয়ে যাবে-এটাই প্রত্যাশা।