ইস্তাম্বুলে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। ছবি: এএফপিতুরস্কে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, সংবাদমাধ্যম বন্ধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিবাদে ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। শনিবার অনুষ্ঠিত এসব বিক্ষোভে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাদের অভিযোগ, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, সংবাদমাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে।
তুরস্কের সাংবাদিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ১১ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি, সেন্সরশিপ বন্ধ এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশে অন্তত তিন হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁরা কারাবন্দি সাংবাদিকদের ছবি হাতে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা বলেন, ‘আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে!’ তাঁদের আরেকটি স্লোগান ছিল, ‘আমরা চাপের কাছে মাথা নত করব না।’
আঙ্কারাতেও অন্তত তিন হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ‘সেন্সরশিপ চলবে না’ এবং ‘কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি চাই’ বলে স্লোগান দেন। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মতে, সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকারও সীমিত করছে।
চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম হাল্ক টিভিতে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় চ্যানেলটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেখানে সরকারনিযুক্ত একজন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তার সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে এ ঘটনাকে দেখা হচ্ছে।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং তথ্যপ্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা স্বাধীন সংবাদ পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম টোয়েন্টিফোরের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এর কারণ হিসেবে ‘সমকামী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যবিষয়ক প্রচারণার’ অভিযোগ তুলে ধরে। প্রতিষ্ঠানটির সমন্বয়ক গোকচের তাহিনজিওলু আঙ্কারায় বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, এদিনের বিক্ষোভ দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সাংবাদিকেরা একত্র হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা স্পষ্টভাবে জানাতে চান যে তারা সাংবাদিকতা করতে চান এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ চান। বন্ধ হয়ে যাওয়া টোয়েন্টিফোরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করায় বিক্ষোভকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তাহিনজিওলু বলেন, স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনতে চান তারা।
ইস্তাম্বুলের বিক্ষোভ শেষে বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রবীণ সাংবাদিক জাফের আরাপকিরলি বলেন, এই সমাবেশের উদ্দেশ্য কেবল সাংবাদিকদের পাশে দাড়ানো নয়। এর সঙ্গে সমাজের মানুষের তথ্য ও সংবাদ জানার অধিকার রক্ষার বিষয়টিও জড়িত। দৈনিক বিরগুনের এই কলাম লেখক নিজেও কয়েকটি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তার মতে, সাংবাদিকদের ওপর চাপ যত বাড়বে, এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধের সংকল্পও তত শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
আরাপকিরলি বলেন, এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করে সরকার সমাজের মানুষকে ভয় দেখাতে, নীরব করতে ও আতঙ্কিত করতে চায়। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে এই চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখাতে হবে যে আমরা এমনটা হতে দেব না। এত দিন আমরা তা করে এসেছি। আমার বিশ্বাস, এখন আমরা আরও বড় পরিসরে এই দৃঢ়তা দেখানোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ ২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর থেকে দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা। এ সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহের ওপরও সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। তাদের দাবি, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং নাগরিকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষা করতে হবে। ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে তারা তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে চান।