ছবি-যাযাদি পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত, শুভ্র পোশাকে সজ্জিত হাজারো হাফেযের সারি, অভিভাবকদের চোখেমুখে আনন্দ-গর্বের দীপ্তি আর কুরআনের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত এক অনন্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে কুরআনের পাখিদের পবিত্রতা, আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে ১৪তম হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড ও কুরআন উৎসব-২০২৬।এ বছর ১৭৫৯ জন হাফেয শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা এবং তাঁদের গর্বিত পিতা-মাতাও সম্মানিত করা হয়েছে ।
আজ ২৬ অক্টোবর(২০২৬) সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিভিন্ন শাখার ১ হাজার ৭৫৯ জন হাফেয শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট, সনদ, পাগড়ি/স্কার্ফ ও অ্যাওয়ার্ড ব্যাগ প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে তাঁদের পিতা-মাতাকেও বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
কুরআনের আলোয় আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা এবং পবিত্র কুরআনের হাফেযদের উৎসাহিত ও সম্মানিত করার মহতী প্রত্যয়ে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন কর্তৃক ১৪তম হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড ও কুরআন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
সন্তানদের কুরআনের হাফেয হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে অভিভাবকদের ত্যাগ, সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ইসলামী চিন্তাবিদ, কুরআন গবেষক, বিশিষ্ট অতিথি, আলেম-উলামা, শিক্ষক, অভিভাবক ও হাজারো হাফেয শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। সকাল থেকেই অভিভাবকদের হাত ধরে একে একে আসতে থাকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাদের অধিকাংশই পবিত্র কুরআনের হাফেয—যাদের কণ্ঠে ধারণ করা রয়েছে আল্লাহর কালাম, আর যাদের ভবিষ্যৎ পথচলায় কুরআনের শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে নৈতিকতা, মানবিকতা ও আলোকিত সমাজ গঠনের দিশারি।
অনুষ্ঠানে হাফেয ছাত্রদের পরনে ছিল সাদা জুব্বা ও মাথায় শুভ্র পাগড়ি। হাফেয ছাত্রীদের পোশাকে আকাশী নীল ও সাদার স্নিগ্ধ সমন্বয়। সবার কাঁধে তানযীমুল উম্মাহর নাম ও লোগোসংবলিত উত্তরীয়। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির বুকে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো তাদের এই সুশৃঙ্খল উপস্থিতি যেন এক পবিত্র সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। হাজারো শিক্ষার্থীর সম্মিলিত উপস্থিতিতে মিলনায়তনজুড়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য দৃশ্য,যেখানে তারুণ্য, শৈশব, ধর্মীয় অনুরাগ ও শিক্ষার সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার।
বর্ণিল সাজসজ্জায় সজ্জিত হল অব ফেমে ও সেলিব্রেটি হলের সৌন্দর্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। সুবিশাল মিলনায়তনের বিভিন্ন স্থানে কুরআন-হাদিসের বাণীসংবলিত রংবেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন ও আধুনিক নকশার সাজসজ্জা অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্নমাত্রা। প্রতিটি আয়োজন যেন স্মরণ করিয়ে দেয়—পবিত্র কুরআন শুধু তিলাওয়াত ও মুখস্থ করার গ্রন্থ নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনকে আলোকিত করার পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে মনোমুগ্ধকর হামদ-নাত, ইসলামী সংগীত, বক্তব্য, আলোচনা ও কবিতা আবৃত্তি উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। একেকটি পরিবেশনা যেন কুরআনের প্রতি ভালোবাসা, মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং ইসলামী মূল্যবোধে জীবন গড়ার প্রত্যয়কে নতুন করে জাগিয়ে তোলার আহ্বান।
১ম অধিবেশনে বিশিষ্ট ইসলামী পন্ডিত অধ্যক্ষ ড. মাওলানা শাহজাহান আল-মাদানীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাফেয ড. এ. বি. এম হিজবুল্লাহ, অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়েদ কামালুদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরি, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. মাওলানা হিজবুর রহমান, চাপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান, উত্তর বাড্ডা কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. আনোয়ার হোসাইন মোল্লা, হাফেয মূর্তজা হাসান ফয়েজী মাসুম, হাফেয ক্বারী হাবিবুল্লাহ বেলালী, অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস প্রমুখ।
২য় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান, আল কুরআন একাডেমি লন্ডন এর চেয়ারম্যান হাফেয মুনীর উদ্দিন আহমদ, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, হাফেয মুফতি আব্দুল কাইয়ুম মোল্লা, হাফেয ক্বারী এ.কে. এম ফিরোজ, বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার অধ্যক্ষ মাওলানা মুশতাক ফয়েজী, ড. খন্দকার সাদে কুর রহমান, হাফেয ক্বারী আবুল হোসাইন, হাফেয লুৎফুর রহমান, ড. হারুনুর রশীদ, সাবেক অধ্যাপক মুফতি ড. আবু ইউছুফ খান।
৩য় অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন, বিশেষ অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ.ফ.ম খালিদ হোসেন, ঢাবির সাবেক ভিসি প্রফেসর নিয়াজ আহমাদ খান, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, শেরপুর -১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য হাফেয রাশেদুল ইসলাম, মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা।
এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন।আরো উপস্থিত ছিলেন ইসলামীফ ফাউন্ডেশনের ডিজি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, হুফ্ফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফাদিলাতুশ শায়খ হাফেয আব্দুল হক, মারকাযুত তাহফীয ইন্টা. মাদরাসার চেয়ারম্যান হাফেয নেছার আহমোদ আন নাছিরি, ইসলামীফ স্কলার হাফেয মুফতি আলী হাসান ওসামা, ড. শহিদুল ইসলাম, হাফেয মুফতি মহিউদ্দিন, মাওলানা শাহ ওয়ালীউল্লাহ, বিশিষ্ট ক্বারী সাইদুল ইসলাম আসাদ, হাফেয ক্বারী জহিরুল ইসলাম, হাফেয ক্বারী গোলাম মোস্তফা, অধ্যাপক ওবায়েদুল হক, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল খলিলুর রহমান মাদানী, হাফেয ক্বারী নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ইসলামী স্কলার ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ ওলীউর রহমান চিশতি, ড. মীম আতিকুল্লাহ, সিনিয়র ডিরেক্টর আ. ন. মু. রাশিদুল ইসলাম সায়েম, মুহা. আসলাম মিয়া, ডিরেক্টর মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ আল-আমিন, আ. থ. ম. মাসুম বিল্লাহ, এইচ. এম আব্দুল্লাহ আল মামুন, মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস, নুরুল আবছার ভূঁইয়া, এম.এম রবিউল ইসলাম, মো: সাইয়েদুর রহমান এবং বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলগণ, শাখা প্রধান, শাখা সহকারী, আমিনুল হিফয, সাংবাদিক, শুভাকাঙ্ক্ষী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মণ্ডলী।
শিক্ষামন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য ডক্টর আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন বলেন, “নৈতিক, ইসলামি ও ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে সমাজে অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। দ্বীনি শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়া জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। তাই আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
একই সঙ্গে বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপরও জোর দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নেও সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি।
তৃতীয় ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তারা আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে কর্মক্ষেত্রে আরও ভালো সুযোগ পাবেন। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়তে পারে।”
হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ডের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও কুরআন মুখস্থ করা, বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শেখা এবং কুরআনের শিক্ষা জীবনে ধারণ করার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে। একই সঙ্গে এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের ১৪তম হিফযুল কুরআন অ্যাওয়ার্ড ও কুরআন উৎসব ছিল কুরআনের প্রতি ভালোবাসা, হিফযের মর্যাদা, অভিভাবকদের আত্মত্যাগ এবং দ্বীনি শিক্ষার সৌন্দর্য উদযাপনের এক স্মরণীয় আয়োজন। হাজারো হাফেযের উপস্থিতিতে এই উৎসব যেন এক বার্তাই উচ্চারণ করেছে—কুরআনের আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি হৃদয়, নৈতিকতা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ হোক প্রতিটি জীবন, আর কুরআনের আদর্শে গড়ে উঠুক আগামী প্রজন্ম।