পররাষ্ট্রনীতিতে সরকারের ১৮০ দিন: বহুমুখী কূটনীতির নতুন অধ্যায়

ড. মোঃ মিজানুর রহমান

মতামত

গত ১৮০ দিনে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন—বিশেষ করে যখন গত প্রায় ১৭ বছরে একটি নির্দিষ্ট

2026-08-18T20:39:41+06:00
2026-08-18T20:39:41+06:00
শনিবার ● ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
পররাষ্ট্রনীতিতে সরকারের ১৮০ দিন: বহুমুখী কূটনীতির নতুন অধ্যায়
ড. মোঃ মিজানুর রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৯ পিএম  
সংগৃহীত ছবি
গত ১৮০ দিনে একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন—বিশেষ করে যখন গত প্রায় ১৭ বছরে একটি নির্দিষ্ট ধারায় সেই নীতি গড়ে উঠেছে। তবে বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারে পুনঃসমন্বয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একক নির্ভরতার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, পারস্পরিকতা ও বহুমুখী কূটনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান; ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভারসাম্যে নেওয়ার পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, তুরস্ক ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও তারই ইঙ্গিত। তবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে কূটনৈতিক অবস্থানকে কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা, নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদায় রূপান্তর করা যায় তার ওপর।

একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কেবল বন্ধুত্ব বা বৈরিতার হিসাব নয়; এটি তার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য তাই প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও কৌশলগত ভারসাম্যভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি। গত প্রায় ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল বাংলাদেশ ক্রমে ভারতকেন্দ্রিক ও একমুখী নির্ভরতার দিকে চলে গিয়েছিল কি না। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং দুই দেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যখন কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিকতার বদলে একতরফা নির্ভরতার ধারণা তৈরি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই সম্পর্কের লাভ-ক্ষতির ভারসাম্য কোথায়?

গত দেড় দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ আমদানি, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বাণিজ্যে দুই দেশের সহযোগিতা বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তা ও অভিন্ন নদীর পানি, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষও বেড়েছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করেছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ছিল ট্রানজিট আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সুফল। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেছে—বাংলাদেশ কি এসব সুবিধার ন্যায্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য পেয়েছে?

বাণিজ্যেও ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘদিনের। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বাজার ভারতীয় পণ্যের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত হলেও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশে অশুল্ক বাধা, মানদণ্ড, কাস্টমস জটিলতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বন্ধুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা ন্যায্য ও পারস্পরিক লাভজনক—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পানি প্রশ্নটি আরও স্পর্শকাতর। গঙ্গার পানি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও তিস্তা চুক্তির দীর্ঘসূত্রতা এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে অমীমাংসিত অবস্থান বাংলাদেশের মানুষের হতাশা বাড়িয়েছে। উজানে বাঁধ, ব্যারাজ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। পানি শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই বাংলাদেশের মানুষের প্রশ্ন স্বাভাবিক—বন্ধুত্ব যদি সত্যিই পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জীবন ও কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পানির ন্যায্য হিস্যা এখনও নিশ্চিত হলো না কেন?

রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষণে অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল এবং ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ঘিরে ভারতের অবস্থান ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এসব অভিযোগের সবকটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না; তবে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল—দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে—সেটিকে উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক পুনঃসমন্বয়ের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার পরিবর্তে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বিদ্যমান সম্পর্কগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্প বাড়ানো—এগুলো এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের ‘Bangladesh First’ নীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা এ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সফরের আমন্ত্রণের পর বাংলাদেশ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যে অবস্থান দেখিয়েছে, দেশের একটি বড় অংশ সেটিকে কূটনৈতিক আত্মমর্যাদার প্রকাশ হিসেবে দেখছে। এর তাৎপর্য শুধু একটি সফর করা বা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মূল বার্তাটি হলো—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই নেবে।
তবে দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি কখনোই ভারতবিরোধী হওয়া উচিত নয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রয়োজন সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং সম্পর্ককে নতুন ভারসাম্যে নিয়ে যাওয়া। বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আনুগত্য নয়; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু একতরফা সুবিধা নয়; ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকবে, কিন্তু ন্যায্য মূল্য ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে; বাণিজ্য থাকবে, কিন্তু একমুখী বাজার নয়; নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়। অর্থাৎ দূরত্ব নয়, ভারসাম্য; বৈরিতা নয়, পারস্পরিকতা; নির্ভরতা নয়, সমতা।

সীমান্তও এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও অবৈধ চলাচল বন্ধে দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি বন্ধ, মানবিক আচরণ নিশ্চিত এবং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা জরুরি। নিরাপত্তা সহযোগিতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেবে।

করিডোর, ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভূগোল একটি জাতীয় সম্পদ। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে চাইবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কতটা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন। ট্রানজিট বা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব, রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার স্বচ্ছ হিসাব থাকতে হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের জন্য সুবিধার করিডোর হতে পারে, তবে সেটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির উৎসও হতে হবে।

বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হতে পারে চীন। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো অংশীদার। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে ভারতনির্ভরতার পরিবর্তে চীননির্ভরতা তৈরি করাও কোনো সমাধান নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত চীনের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কাজে লাগানো।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও চীন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু অস্ত্র কেনার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি হবে না। প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, গবেষণা, যৌথ উৎপাদন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতার উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন নয়; বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কৌশলগত আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পাকিস্তানের সঙ্গেও দীর্ঘ রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের কাছে অমোচনীয় এবং এর প্রতি সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্বার্থে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানো সম্ভব। ইতিহাসকে সম্মান করা এবং ভবিষ্যৎ স্বার্থে বাস্তববাদী কূটনীতি পরিচালনা—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

একইভাবে তুরস্ক, সৌদি আরব ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, জ্বালানি, কৃষি, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বিস্তৃত করা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের দক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তির চাহিদাকে সমন্বিত করে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরি করা যেতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থ যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং চীনের বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার ও প্রযুক্তি, ভারতের যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার—সবকিছুকে বাংলাদেশের স্বার্থে সমন্বয় করাই হবে প্রকৃত বহুমুখী কূটনীতি।

এই কূটনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে অর্থনৈতিক কূটনীতি। পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য কেবল বৈঠক, সফর বা যৌথ বিবৃতির সংখ্যায় মাপা যাবে না; বরং কত বিনিয়োগ এল, কত নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি হলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি দেশে এলো, জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা শক্তিশালী হলো এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় কতটা বাড়ল—এসব বাস্তব সূচকেই তার সাফল্য বিচার করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, আইসিটি, হালকা প্রকৌশল, সিরামিক, জাহাজ নির্মাণসহ সম্ভাবনাময় খাতের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন শ্রমবাজার এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। এটাই হবে ‘Bangladesh First’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় সম্পদ। বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থা, দ্রুত পণ্য পরিবহন এবং স্বচ্ছ ও ন্যায্য আঞ্চলিক চুক্তি। বাংলাদেশের ভূগোলকে শুধু অন্য দেশের যোগাযোগের সুবিধা হিসেবে নয়, নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি চায় না; তারা চায় অসম সম্পর্কের অবসান। একইভাবে ভারতনির্ভরতার পরিবর্তে চীননির্ভরতা বা অন্য কোনো নতুন নির্ভরতাও তারা চায় না। ‘Bangladesh First’ তাই কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; এটি প্রতিটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, বাণিজ্যিক সমঝোতা, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।

ভারত থাকবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ প্রধান বাজার ও বিনিয়োগের উৎস, তুরস্ক ও মুসলিম বিশ্ব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বাস্তববাদী ও স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো দেশই বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হবে না। বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তার অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, মানবসম্পদ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

অতএব, গত ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ২০২৪-পরবর্তী বৈদেশিক সম্পর্কের পুনঃসমন্বয়কে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশলের ভিত্তিতে রূপ দিতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ছায়ায় অবস্থান নয়, বরং নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে সব শক্তির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দর্শন তাই এক বাক্যে বলা যায়—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে অন্ধ নির্ভরতা নয়; জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ভারতমুখিতা থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ ভারতকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, তুরস্ক, মুসলিম বিশ্বসহ বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে বহুমুখী, ভারসাম্যপূর্ণ ও সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই পথেই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় মর্যাদা এবং একটি নতুন পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাবনা নিহিত।

লেখকঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত