রংপুরে ৪৫০ গাড়ির লংমার্চ, জ্বালানি পোড়ানো নিয়ে রিজভীর প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি

রাজনীতি

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে অপপ্রচার

2026-09-22T18:03:52+06:00
2026-09-22T18:03:52+06:00
শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
রাজনীতি
রংপুরে ৪৫০ গাড়ির লংমার্চ, জ্বালানি পোড়ানো নিয়ে রিজভীর প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:০৩ পিএম  
ছবি-যাযাদি
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বৈশ্বিক সংকটের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জনস্বার্থে কর্মসূচি করার দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলোর রংপুর অভিমুখী লংমার্চে ৪৫০টি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। 

রিজভী বলেন, ‘আপনাদের কিছু দাবি আছে-দুর্নীতির বিরুদ্ধে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইত্যাদি। বেশ কয়েক দফা দাবি দিয়ে আপনারা ১১ দলীয় জোট এই প্রোগ্রামটি করছেন। ভালো কথা। আমার একটি প্রশ্ন, জনগণের প্রতি যদি আপনাদের দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে রংপুরে আপনারা গেলেন-রংপুরে তো আপনাদের সংগঠন আছে। আপনারা এমনিতেই গিয়ে বক্তৃতা করতেন। ৪৫০ গাড়ি নিয়ে সেখানে গেলেন।’

তিনি বলেন, ‘এই জ্বালানি সংকটের সময় এই ৪৫০ গাড়ি ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলে গেল। এই ৪৫০ গাড়ির যে জ্বালানি পুড়ল, তা হতে দিলেন কেন? বরং ওটা যদি না পুড়ত, তাহলে আমাদের অনেক সাশ্রয় হতো। আজকে ন্যাশনাল গ্রিডে আমাদের গ্যাস কম, আমাদের বিদ্যুৎ কম। এই জ্বালানি সাশ্রয় হলে কিছুটা তো কাজে লাগত।’

রিজভীর দাবি, যমুনা সেতুর টোল আদায়ের হিসাব অনুযায়ী ৪৫০টি গাড়ি রংপুরে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৪৫০ এটা কিন্তু বানিয়ে বলছি না। যমুনা ব্রিজের টোলের যে হিসাব, সেই হিসাবে ৪৫০ গেছে।’

বৈশ্বিক সংকটের কথা তুলে ধরলেন রিজভী

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের প্রসঙ্গে বৈশ্বিক সংকটের কথা তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ওই পথ দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি তেলের জাহাজ আসে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রিজভীর ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা থাকতে পারে কিংবা আকাশ থেকে বোমা পড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় তেলের জাহাজগুলো চলতে চাইছে না। এ কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, ‘এই বৈশ্বিক সংকটের কারণে আজকে এই যে মূল্য বৃদ্ধি, সেটা বিবেচনায় আপনারা নিচ্ছেন না। না নিয়ে অপপ্রচার দিচ্ছেন।’

জ্বালানি তেলের দাম প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘আমাদের ১ লিটার ডিজেল কিনতে হয় ২০৫ টাকা দিয়ে। জনগণের কাছে সেটা বিক্রি করতে হয় ১১৫ টাকা দিয়ে। গতকালকের আগ পর্যন্ত। তাতে আমাদের ৯০ টাকা লোকসান দিতে হয়। এই মূল্য সমন্বয়ের পর এখন তবুও ৭০ টাকা লোকসান দিতে হবে।’

বিভিন্ন দেশের ডিজেলের দামের তুলনাও তুলে ধরেন তিনি। রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, নেপালে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৬১ টাকার কিছু বেশি, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকার কিছু বেশি, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ১১৫ টাকা দরে ডিজেল বিক্রি করার সময় ভারতেও দাম ছিল ১৩৪ টাকার কিছু বেশি।

রিজভী বলেন, ‘এই যে ২০ টাকা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, তাতেও লোকসান দিতে হবে ৭০ টাকা। তারপরেও ওদের চাইতে কম।’

‘দাম যেখানে বেশি, পণ্য সেদিকে চলে যাবে’

জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহের উদাহরণ দেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘একদিকে দাম বাড়বে আরেকদিকে দাম কমবে-এটা হলো একটা ন্যাচারাল অর্থনৈতিক প্রবাহ। নদীর পানি যেমন উপর থেকে গড়িয়ে সমুদ্রের দিকে যায়, অর্থনীতিও নদীর পানির মতো। যেখানে দাম বেশি আর যেখানে দাম কম, সেখানে গড়িয়ে চলে যাবে।’

তাঁর ভাষ্য, তেলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি উপলব্ধি করার পরও জনগণকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

‘শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না’

বক্তব্যে শেখ হাসিনার শাসনামলের সমালোচনাও করেন রিজভী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশকারীরা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন এবং যে কেউ যেকোনো সময় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা মিথ্যা মামলায় কারাগারে যাওয়ার শিকার হতে পারতেন।

রিজভী বলেন, ‘শেখ হাসিনার নিপীড়ন আমার কাছে তাদের চাইতেও কোনো কোনো সময় বেশি মনে হয়েছে। এবং নিপীড়নের মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ।’

তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা দেশকে নিজের জমিদারি মনে করতেন এবং এ কাজে তাঁর কিছু আন্তর্জাতিক ‘প্রভু’ তাঁকে মদদ দিতেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘আমার যে বক্তব্য, আজকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা কিছু রাজনৈতিক দল তাদের সুর-যেটা রাশেদ এখানে বলেছে-কিছুটা তাদের সুর এখন দেখছি একটু ভিন্নতর।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচিতে লংমার্চ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কর্মসূচিতে বৈশ্বিক সংকটের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে।

‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে সরকার’

রিজভী বলেন, বিরোধী দল গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করুক, এতে আপত্তি নেই। তবে কর্মসূচির নামে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার দায়ও তাদের নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র আছে, কথা বলবেন, জোরালো সমালোচনা করবেন। পার্লামেন্টের ভিতরেও করতে পারেন, বাইরেও করতে পারেন।’

রিজভীর দাবি, বিভিন্ন জায়গায় লংমার্চ করার সময় সরকার বা সরকারের পক্ষের কোনো দল তাদের বাধা দেয়নি।

তিনি বলেন, ‘আজকে সরকার বা সরকারের পক্ষের যারা দল, তারা কোথাও একটা টু পরিমাণ, সামান্য পরিমাণ পর্যন্ত আপনাদের কোথাও কোনো ধরনের বাধা দেওয়া বা একটা ছোট্ট একটা ইট নিক্ষেপ করা—সেটা করেনি।’

তাঁর ভাষ্য, ‘এই যে ডেমোক্রেটিক এনভায়রনমেন্ট-এই এনভায়রনমেন্টটাই জরুরি আমাদের এই সমাজের মধ্যে। সেটাই আজকে এই দেশের সরকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।’

বাস-ট্রেনে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ নিয়েও অভিযোগ

রিজভী বলেন, বিভিন্ন স্থানে বাসে আগুন, ট্রেনে আগুন এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন দেখছি মধ্যবাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, কাফরুল-বাসে আগুন দিতে। আমরা দেখছি ট্রেনে আগুন দিতে। আমরা দেখছি হাইকোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ করতে। আমরা দেখছি ইউনিভার্সিটির মেইন গেটের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ।’

রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে রিজভী বলেন, ‘আপনারা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য লংমার্চ করছেন। আপনারা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লংমার্চ করছেন। দুর্নীতি হচ্ছে বলে লংমার্চ করছেন। তো এই যে পরিকল্পিত সন্ত্রাস যে করছে-এর বিরুদ্ধে একটা লংমার্চ করুন। এর বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদসভা বা বিক্ষোভ মিছিল করুন দেখি।’

রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে একদিকে বিরোধী বক্তব্য ও অন্যদিকে উসকানি দিয়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা

বক্তব্যের একপর্যায়ে জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করেন রিজভী। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে দলটির ভূমিকা জনগণের পক্ষের ছিল না।

রিজভী বলেন, পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ-প্রত্যেকটি আন্দোলনের বিরোধিতা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কখনোই জনগণের পক্ষের কোনো আন্দোলনে আপনাদের কোনো ভূমিকা নেই।’

ইসলামের নামে রাজনীতি করার প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, ইসলাম নীতি-নৈতিকতাকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। তিনি ‘মুনাফিক’ শব্দটির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

‘অপপ্রচারের ঘেরাটোপে ন্যায্য সরকারি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা যাবে না’

দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত নিয়েও বক্তব্য দেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘এখনো তো কেউ বলতে পারে না যে বাংলাদেশের ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশের আর্থিক সংস্থাগুলো লুটপাট করছে নতুন সরকারের কেউ কেউ।’

তাঁর দাবি, ব্যাংকিং খাত গোছানোর প্রচেষ্টা চলছে। একেক করে ব্যাংকগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং মানুষ টাকা পাচ্ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং আমানতকারীদের অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে দাবি করেন রিজভী। তাঁর ভাষ্য, এর ফলে বাইরে থেকে গ্যাস ও জ্বালানি তেল কেনার সক্ষমতা অর্জন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন বৈশ্বিক বাধাগুলো দূর হলে পরেই আমাদের রান্নাঘরের চুলা জ্বলবে, আমাদের মিল-কলকারখানাগুলো সতেজ হবে এবং স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড আবার শুরু হবে।’

 রিজভী বলেন, ‘অপপ্রচারের ঘেরাটোপের মধ্যে একটি ন্যায়সঙ্গত সরকারি কার্যক্রম বা সরকার পরিচালনা-সেটিকে বাধাগ্রস্ত করা যায় না।’

আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়কারী ব্যারিস্টার নাসিম খান, জোটের মুখপাত্র এস এম শাহাদাতসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
  বিষয়:   গাড়ির লংমার্চ  জ্বালানি পোড়ানো  রিজভীর প্রশ্ন 


রাজনীতি- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত