গাড়িমুক্ত দ্বীপে প্রকৃতির সান্নিধ্য, ইতালির মন্টে ইসোলায় শরতের ভ্রমণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

লাইফস্টাইল

ইতালির ইজেও হ্রদের নীলাভ জল, পাহাড়জুড়ে শরতের রঙ আর নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের জন্য তৈরি করেছে অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। হ্রদের বুকে

2026-10-12T19:22:17+06:00
2026-10-12T19:26:16+06:00
সোমবার ● ১২ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
লাইফস্টাইল
গাড়িমুক্ত দ্বীপে প্রকৃতির সান্নিধ্য, ইতালির মন্টে ইসোলায় শরতের ভ্রমণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২২ পিএম  আপডেট: ১২.১০.২০২৬ ৭:২৬ পিএম 
ইসেও হ্রদের ওপর মন্টে ইসোলা এবং তীরে কারজানো গ্রাম । ছবি : সিমোন পোলাত্তিনি/দ্য গার্ডিয়ান
ইতালির ইজেও হ্রদের নীলাভ জল, পাহাড়জুড়ে শরতের রঙ আর নিরিবিলি পরিবেশ পর্যটকদের জন্য তৈরি করেছে অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। হ্রদের বুকে অবস্থিত মন্টে ইসোলা দ্বীপে গাড়িমুক্ত সড়কে সাইকেল চালানো, পুরোনো জেলেপল্লি ঘুরে দেখা এবং ঘন বনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় হাইকিং করার সুযোগ রয়েছে। ইতালির সবচেয়ে বড় হ্রদদ্বীপ হিসেবে পরিচিত এই স্থানটি কোমো ও গার্দা হ্রদের আশপাশের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকার তুলনায় অনেকটাই শান্ত।

শরতের লালচে বাদামি ও গাঢ় কমলা রঙে সাজতে শুরু করেছে হ্রদের চারপাশের পাহাড়। সোনালি রোদে ঝলমল করছে জলরাশি। খাড়া পাহাড়, ঘন বন, পুরোনো জেলেপল্লি ও পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা গ্রামগুলো মন্টে ইসোলাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।

ভ্রমণ শুরু হয় ছোট বন্দরনগরী পেশকিয়েরা মারালিও থেকে। সুলজানো থেকে ফেরিতে মাত্র পাচ মিনিটের পথ পেরিয়ে দ্বীপে পৌছানো যায়। বন্দরে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে থাকা ডোরাকাটা কাঠের নৌকাগুলো ভেনিসের গন্ডোলার কথা মনে করিয়ে দেয়।

দ্বীপটির বিশেষত্ব হলো গাড়ি চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ। ভ্রমণসঙ্গী ও গাইড চিয়ারা জানান, দ্বীপে মাত্র তিনজনের গাড়ির মালিক হওয়ার অনুমতি রয়েছে, তারা হলেন পুরোহিত, চিকিৎসক ও মেয়র। স্থানীয় বাসিন্দারা খাড়া সড়কে মোটরসাইকেল চালান। পাশাপাশি সারাদিন চলাচল করে ছোট ভ্যানের মতো দেখতে বাস। তবে দর্শনার্থীদের দ্বীপ ঘুরে দেখতে হয় হেটে অথবা সাইকেলে।

সপ্তাহান্তে ফেরিতে সাইকেল নেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বন্দরের আশপাশে সাইকেল ভাড়ার দোকান থাকায় পর্যটকদের খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয় না। সাধারণ সাইকেল ভাড়া শুরু হয় ঘণ্টায় চার ইউরো থেকে।

গাড়িমুক্ত সড়ক নতুন সাইকেলচালকদের জন্যও স্বস্তিদায়ক। দ্বীপের মসৃণ ও শান্ত পথে ধীরে ধীরে সাইকেল চালাতে চালাতে হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এখানে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে রেকর্ড গড়ার চেয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে অবসর কাটানোই বেশি উপভোগ্য।

হ্রদের তীর ঘেষে বৃত্তাকার সাইকেলপথটি জলপাইবাগানের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে। শরতের সময়েও আবহাওয়া বেশ উষ্ণ থাকতে পারে। ভ্রমণের সময় তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে গরম কাপড়ের পরিবর্তে টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরেই সাইকেল চালানো সম্ভব হয়েছে।

দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে সেনসোলে নামের ছোট জনপদ পেরিয়ে মেনজিনোতে পৌছানো যায়। সেখানে সাইকেলচালকদের জন্য উপযোগী একটি ক্যাফে-বার রয়েছে। হ্রদের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে এক কাপ এসপ্রেসো পান করার সুযোগও মেলে।
লাগো ডি ইসেও-তে ‘পেশি রালি’ মাছ শুকানো হচ্ছে । ছবি: ম্যাথিয়াস শোলজ
দ্বীপের পশ্চিম দিকের দৃশ্যের কিছুটা সৌন্দর্য নষ্ট করেছে মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত বড় একটি কংক্রিট কারখানা। সেখান থেকে সাইকেল চালিয়ে দ্বীপের প্রধান জনপদ সিভিয়ানোতে পৌছানো যায়। এখানকার সরু রাস্তাগুলো বেশ নিরিবিলি। কমলা, লেবু ও হালকা গোলাপি রঙের বাড়ির সারির মধ্যে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে সান্তি ফাউস্তিনো এ জিওভিতা গির্জা এবং একটি মধ্যযুগীয় পাথরের টাওয়ার।

রোমান যুগ থেকেই মন্টে ইসোলায় মানুষের বসবাসের ইতিহাস রয়েছে। ১৫ ও ১৬ শতকে ভেনিসের শাসনামলে দ্বীপের প্রধান জনপদগুলোর স্থাপত্যে পরিবর্তন আসে। কোমো ও গার্দা হ্রদের আশপাশের গ্রামের মতো এখানেও পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে তৈরি হয় কাঠের জানালার পাল্লাযুক্ত বিভিন্ন রঙের বাড়ি।

১৮ শতকের শেষ দিকে দ্বীপটির অন্যতম প্রধান শিল্প হয়ে ওঠে মাছ ধরার জাল তৈরি। সিভিয়ানোর বন্দরের কাছে অবস্থিত রেতিফিচিও লা রেতে নামের একটি ছোট দোকান ও জাল তৈরির কারখানায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাতে জাল বোনা হচ্ছে। মাছ ধরার জালের পাশাপাশি বাস্কেটবল হুপ, ফুটবল গোলপোস্ট, বাজারের ব্যাগ ও হ্যামকের জন্যও জাল তৈরি করা হয়।

দ্বীপের উত্তর প্রান্ত থেকে ইজেও হ্রদের সবচেয়ে খাড়া ও দুর্গম পাহাড়গুলোর দৃশ্য দেখা যায়। হ্রদের দক্ষিণ অংশে ঢেউখেলানো পাহাড়ের গায়ে বিস্তৃত ফ্রানচিয়াকোর্তা অঞ্চলের আঙুরবাগান এবং চকসাদা গির্জার ঘণ্টাঘর চোখে পড়ে। অন্যদিকে উত্তরের পাহাড়গুলো খাড়া ঢালে নেমে গেছে পান্না-সবুজ জলরাশির দিকে।

হ্রদের তীর থেকে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি দ্বীপ ইসোলা দি লোরেতো। দ্বীপটির ওপর দুর্গের মতো দেখতে একটি বিশাল ভবন রয়েছে, যা ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে জানান গাইড চিয়ারা। মারোনে এলাকা থেকে আসা একদল কায়াকারকে শান্ত জল পেরিয়ে ওই দ্বীপের ব্যক্তিগত ঘাটের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।

কারজানো জনপদে সান জিওভান্নি বাতিস্তা গির্জার গোলাপি ও সাদা রঙের সম্মুখভাগ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর দ্বীপের পূর্ব তীরের তুলনামূলক সাধারণ সড়ক ধরে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। এ পথে একসময় একটি পুরোনো ফিয়াট পুন্টো গাড়ির দেখা মেলে। গাড়িটি ধীরে ধীরে চলছিল। দ্বীপে গাড়ি ব্যবহারের সীমিত অনুমতির কথা মনে করে চালক চিকিৎসক কিংবা পুরোহিত কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়।

সাইকেলে পুরো দ্বীপ ঘুরে আবার পেশকিয়েরা মারালিওতে ফিরে আসা যায়। সেখানে লা ফোরেস্তা রেস্তোরায় হ্রদের মাছ দিয়ে তৈরি খাবার দিয়ে দুপুরের আহার সারা যায়। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভিনেগারে সংরক্ষিত টেঞ্চ মাছ, চাব মাছের কার্পাচ্চিও এবং গ্রিল করা পোলেন্তার সঙ্গে পরিবেশিত শুকনো ও লবণ দেওয়া সারদিনাস মাছ।

দিনের শেষ ফেরিগুলো ছেড়ে যাওয়ার পর পেশকিয়েরা মারালিওতে নেমে আসে শান্ত পরিবেশ। দ্বীপে থাকার জন্য রয়েছে ব্যক্তিগত ছুটির আবাসন এবং রেস্তোরার সঙ্গে যুক্ত কক্ষ। ডেসিও নামের একটি আধুনিক বিস্ত্রোর নিচতলায় রেস্তোরা এবং ওপরতলায় কয়েকটি আধুনিক কক্ষ রয়েছে। কাচঘেরা সামনের অংশ থেকে হ্রদের নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। সূর্যাস্তের কমলা আলোয় কক্ষগুলোও আলোকিত হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যায় ল'ইসোলা দেই সাপোরি নামের একটি খোলা জায়গার রেস্তোরায় বসে স্থানীয় খাবার ও ফ্রানচিয়াকোর্তা অঞ্চলের ঠান্ডা ঝলমলে পানীয় উপভোগ করা যায়। স্থানীয় সালামি, জলপাই ও মাছের বিভিন্ন পদ দিয়ে হালকা রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়।

পরদিন সাইকেলের পরিবর্তে পাহাড়ি পথে হাটার প্রস্তুতি নেওয়া যায়। পেশকিয়েরা মারালিওর পাথর বসানো সরু রাস্তা দিয়ে শুরু হওয়া পথটি ধীরে ধীরে ঘন চেস্টনাট বনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। চূড়ায় পৌছাতে প্রায় ৪৫০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়। পথে পাথর ও গাছের আকাবাকা শিকড়ের কারণে হাটা কিছুটা কঠিন হয়ে ওঠে। এক পাশে রয়েছে খাড়া ঢাল। তবে গাছের ফাঁক দিয়ে ইজেও হ্রদের ঝলমলে দৃশ্য পুরো পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

প্রায় এক ঘণ্টা হাটার পর বন পাতলা হয়ে আসে এবং সামনে দেখা দেয় সান্তুয়ারিও দেলা মাদোন্না দেলা চেরিওলা। ত্রয়োদশ শতকে একটি প্রাচীন পৌত্তলিক মন্দির ও প্রাথমিক খ্রিষ্টীয় উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত এই সাদা উপাসনালয়টি দ্বীপের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। ভেতরে রয়েছে সোনালি রঙের বিশাল বেদি ও সূক্ষ্ম কারুকাজের ফ্রেস্কোচিত্র।

তবে এই হাইকিংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ উপাসনালয়ের বাইরের প্যানোরামিক দৃশ্য। পাহাড়ের ওপর থেকে ইজেও হ্রদ, আশপাশের জনপদ ও দূরের পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। নিচে সুলজানোর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ফেরিগুলোকে খেলনা নৌকার মতো দেখায়। পেছনে পড়ে থাকে পানিতে তৈরি সাদা ঢেউয়ের রেখা।

উচু থেকে দেখা যায়, বনের পাতায় ধীরে ধীরে শরতের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। ঋতু যত এগোবে, প্রকৃতির রূপ তত বদলাবে। চেস্টনাট গাছের ফলও তখন আরও বেশি ঝরে পড়বে। প্রকৃতির এই পরিবর্তন মন্টে ইসোলাকে শরতের ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তুলেছে।

ভ্রমণটির আয়োজন করে ভিজিট ব্রেসিয়া। মন্টে ইসোলায় সাইকেল ভাড়া ঘণ্টায় চার ইউরো থেকে শুরু। সুলজানো থেকে দ্বীপে ফেরির একমুখী ভাড়া ২.৬০ ইউরো। ব্রেসিয়া থেকে সুলজানো পর্যন্ত ট্রেনের ভাড়া শুরু ৪.১০ ইউরো থেকে। ডেসিওতে সকালের নাশতাসহ কক্ষ ভাড়া শুরু ৯০ ইউরো থেকে। 


প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত ও সম্পাদিত


  বিষয়:   ইতালি  ভ্রমণ  মন্টে ইসোলা  পর্যটন 


লাইফস্টাইল- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত