নাটোরের চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর ঝাকে ঝাকে উড়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি —যাযাদি মো. সোহাগ আরেফিন, গুরুদাসপুর (নাটোর)
শীতের আগমনী বার্তায় নতুন রূপে সেজেছে নাটোরের চলনবিল। বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর নীল আকাশে ঝাকে ঝাকে উড়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। কখনো অগভীর পানিতে ডুব দিয়ে খাবার খুজছে, কখনো দল বেধে বসছে বিলের কিনারে। পাখির কলকাকলি, ডানার ঝাপটানি আর জলরাশির মিতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে বিলের প্রকৃতি। তবে এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে উদ্বেগ—অবৈধ পাখি শিকার, জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা।
সরেজমিনে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কোথাও সাদা বকের সারি, কোথাও পানকৌড়ির ডুবসাতার, আবার কোথাও বালিহাসের দল খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদাবক, বালিহাস, পানকৌড়ি, ডাহুক ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনায় বিল জুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পাখির এই বিচরণ দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
মৎস্য ও শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিল নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলে বিলের বিভিন্ন স্থানে অগভীর জলাভূমি তৈরি হয়। খাবারের সন্ধানে এসব স্থানে জড়ো হয় নানা প্রজাতির পাখি। তাদের বিচরণে প্রাণ ফিরে পায় বিলের প্রকৃতি। তবে পাখিদের এই অবাধ বিচরণ সব সময় নিরাপদ নয়।
অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির অসাধু শিকারি বাশের খুটি, কলাপাতা ও খেজুরের ডালসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পাখি ধরার ফাদ পেতে রাখেন। কোথাও কোথাও বিষটোপ প্রয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে বিলে আসা পাখিরা এভাবে শিকারিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এর সঙ্গে জলাভূমি সংকোচন ও পানির স্বল্পতা যুক্ত হওয়ায় পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু শিকারি ফাদ পেতে এসব পাখি শিকার করেন। পাখি রক্ষায় তাদের সংগঠন ২০১২ সাল থেকে চলনবিলের দুর্গম এলাকায় কাজ করছে।
স্থানীয় আব্দুস সামাদ, মোসলেম উদ্দিনসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, অতিথি পাখি প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ফসলের জমির বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এসব পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে চলনবিলের উপযুক্ত এলাকায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো এবং জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের অভিযানও চলছে। রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপক ও পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সহযোগিতায় পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাখি শিকারের অপরাধে জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হচ্ছে।’
নাটোর-৪ আসনের এমপি মো. আব্দুল আজিজ বলেন, ‘চলনবিল এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই জলাভূমিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এর পরিবেশ ও পাখি রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।’