একাত্তর এবং বাংলাদেশ

শাহীন রাজা

মতামত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহকে নিয়ে পক্ষে, বিপক্ষে দুই পক্ষ সরব। অথচ বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী একদম নীরব। মোহাম্মদ

2026-09-21T21:00:40+06:00
2026-09-21T21:03:19+06:00
সোমবার ● ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
মতামত
একাত্তর এবং বাংলাদেশ
শাহীন রাজা
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:০০ পিএম  আপডেট: ২১.০৯.২০২৬ ৯:০৩ পিএম 
শাহীন রাজা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহকে নিয়ে পক্ষে, বিপক্ষে দুই পক্ষ সরব। অথচ বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী একদম নীরব। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পাকিস্তানের জাতির পিতা। পাকিস্তান জনগণ তাকে সম্মান করে। করে শ্রদ্ধা। এবং তাদের কাছে সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। এ নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এই সম্মানিত লোককে বাংলাদেশে কেন টেনা আনা? বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে উপস্থাপন করতে যেয়ে লোকটিকে অসম্মান করা হয়েছে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বিষয়টি। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার কি অবস্থান। শুধু শুধু ভিনদেশের এক জন সম্মানিত লোককে টেনে এনে অসম্মান করা। 

জিন্নাহকে নিয়ে বিতর্কে এক পক্ষের যুক্তি হচ্ছে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে বাংলাদেশ হতো না। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, একাত্তরে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। তবে ঐতিহাসিক সত্যতা হলো, এই নদীমাতৃক  ভূখণ্ড শুরু থেকেই নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সত্তা নিয়ে একটা নির্দিষ্ট জনবসতি ছিল। এই অঞ্চলের মানুষ ছিল স্বনির্ভর এবং শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী। এই ভূখণ্ডের মানুষ যুদ্ধবিগ্রহ পছন্দ করত না। এমনকি এই ভূখণ্ডের মানুষ কখনোই পররাজ্য আক্রমণ করেনি।

ঐতিহাসিক রাখাল দাশ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, রাঢ় অঞ্চল এবং সমতট (বাংলাদেশ) লোকজনের জীবনচরিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই বাংলার মাটি ভিন্ন। রাঢ় অঞ্চলে মাটি হচ্ছে লাল ও শক্ত। 

সমতটের মাটি হচ্ছে নরম এবং দোআশ। এমনকি দুই বাংলার নদীগুলোর চরিত্রও দুই রকম। সুতরাং, যারা বলতে চায়, এক বাঙলা কথাটা ঠিক নয়। ওপার বাংলার জনমানুষ আমাদের প্রতিবেশী এবং বন্ধু। কিন্তু আমরা ভিন্ন ঘরের বসতি। সুতরাং, বাংলাদেশ নিজ সত্তায় একটা স্বাধীন, সার্বভৌম ভূখণ্ড। 

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, একাত্তরের পর বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভূখণ্ড ফিরে পায়। এটা কারো দয়া বা অনুকম্পায় নয়। নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে।

এই শান্তিপ্রিয় জনপদ বাইরের শক্তি দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয়েছে। নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে এখানকার জাতিগোষ্ঠী হচ্ছে, দ্রাবিড়। অনার্য সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এদের বসবাস। আর্যগণ এই ভূখণ্ড দখল করার মধ্য দিয়ে তাদের দেবতাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। কিন্তু পুরোপুরি সফল হয়নি। শাসকের বিরুদ্ধে ওই সময় থেকেই শুরু এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ। ভিনদেশি শাসকদের পথ ধরে আসে পাল, সেন এবং সুলতানী শাসন। তারপর আসে মুঘল, পাঠান এবং বৃটিশ। এই শাসক গোষ্ঠীদের শাসনামলে প্রতিবারই এই ভূখণ্ডের মানচিত্র পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে নাম। এবং একটা সময় সবাইকেই এখান থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। পাকিস্তানও এর ব্যতিক্রম নয়। 

বাংলাদেশ বা এই ভূখণ্ড স্বাধীন অঞ্চল হিসেবে এক সময় আত্মপ্রকাশ ঘটবে অন্নদাশঙ্কর তার গ্রন্থে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর তার ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি ও মুক্তবঙ্গের স্মৃতি’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি কেবল অবিভক্ত বাংলার শহরগুলো ঘুরে দেখত, তবে তার মনে হতো পুরো বাংলা বুঝি একটি হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। কিন্তু একটু কষ্ট করে কেউ যদি গ্রামীণ বাংলার মাটি মাড়াত, তবেই তার চোখের সামনে আসল সত্য উদঘাটিত হতো যে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসলে মুসলিম এবং তারাই মূলত এ দেশের কৃষক সমাজ।’ তিনি উল্লেখ করেছেন, সেই সময় এই অঞ্চল ছিল কৃষি ভিত্তিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীল। কৃষক ছিল অর্থনীতির চালিকা শক্তি। অথচ জমিদারগণরা কলিকাতায় ভোগবিলাসের মধ্য দিয়ে জীবনপাত করতেন। এবং পূর্ববঙ্গ ছিল, সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত একটি অনগ্রসর অঞ্চল। 

শ্রেণি বৈষম্যের কারণে এক সময় এই অঞ্চলের লোকেরা  বিদ্রোহ ঘোষণা করত। এবং একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশিত হতো। এই বিদ্রোহ শুধু এই ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকত না। এখন বাংলাদেশ লাগোয়া ইনডিয়ার যেসব অঞ্চল মুক্ত হতে চাইছে তারাও এই বিদ্রোহে অংশীদার হতো। এক সময় ইনডিয়ার একটা বিড়াট অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

এদিকে ঐতিহাসিক রাখাল দাশ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ গ্রন্থে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, রাঢ় অঞ্চল এবং সমতট (বাংলাদেশ) লোকজনের জীবনচরিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই বাংলার মাটি ভিন্ন। রাঢ় অঞ্চলে মাটি হচ্ছে লাল ও শক্ত। সমতটের মাটি হচ্ছে নরম এবং দোআশ। এমনকি দুই বাংলার নদীগুলোর চরিত্রও দুই রকম। সুতরাং, যারা বলতে চায়, এক বাঙলা কথাটা ঠিক নয়। ওপার বাংলার জনমানুষ আমাদের প্রতিবেশী এবং বন্ধু। কিন্তু আমরা ভিন্ন ঘরের বসতি। সুতরাং, বাংলাদেশ নিজ সত্তায় একটা স্বাধীন, সার্বভৌম ভূখণ্ড। 

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, একাত্তরের পর বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভূখণ্ড ফিরে পায়। এটা কারো দয়া বা অনুকম্পায় নয়। নয় মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য, ১৯৪৭ সালে ইনডিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন না হলে স্বাধীনতা লাভ কষ্টের হতো। নদীমাতৃক এই জনগোষ্ঠী কখনোই বা কোনো শাসনামলেই পরাভব মানেনি। স্বাধীন তারা হতোই। তাই ১৯৪৭ সালে ইনডিয়া থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আবুল হাশিম এবং মাওলানা ভাসানীর  প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তাদের প্রতি সব সময় আমাদের সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকবে। 

এই সব বিবেচনা করে ব্যারিস্টার রাজ্জাক মনে করতেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার ঐতিহাসিক ভুল। এর জন্য জামায়াতে ইসলামীর উচিত জাতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এই কথাগুলো তার গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : ইটস হিস্টৃ এন্ড পলিটিকস’ উল্লেখ করেছেন। 

শাহীন রাজা : সিনিয়র সাংবাদিক
মতামত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত