সংগৃহীত ছবিআগা খানের এই উদ্যোগের খবর তৎকালীন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নজরে আসে। বিষয়টি জানার পর তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয়ভারও সরকার বহন করে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সাংবাদিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের মিলনস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস কেবল একটি ভবন বা একটি পেশাজীবী সংগঠনের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, গণতন্ত্রের আন্দোলন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নানা অধ্যায়।
১৯৫৪ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের যাত্রা শুরু
১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব’ হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়। নীতিমালা অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে ক্লাবটি পরিচালিত হয়ে আসছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ঢাকার ১৮ তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচার একটি সরকারি ভবন মাসিক ১০০ টাকা ভাড়ায় প্রেস ক্লাবের প্রধান কার্যালয় হিসেবে বরাদ্দ দেয়। ওই ভবনটি ছিল একটি লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী ভবন, যা পরবর্তীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের আগে ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুও এক সময় এই ভবনে বসবাস করেছিলেন বলে প্রেস ক্লাবের ইতিহাস বিষয়ক স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়। ভবনটি ১৯০৫ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ঢাকার পুরনো প্রশাসনিক ও শিক্ষা জগতের স্মৃতিও জড়িয়ে ছিল।
কলকাতা থেকে ঢাকায় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার পথ
অবিভক্ত বাংলায় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ঢাকায় অনেক আগেই নেয়া হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় প্রথম প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে তৎকালীন সাংবাদিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন। ঢাকায়ও সাংবাদিকদের মধ্যে প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। ১৯৫২ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাংবাদিকদের একটি সম্মেলনে ঢাকায় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উত্থাপিত হয়। তবে সে সময় উদ্যোগটি তেমন সমর্থন লাভ করেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঢাকায় সাংবাদিকদের নিজস্ব একটি পেশাগত প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পঞ্চাশের দশকে সংবাদপত্রের জগৎ ছিল তুলনামূলক ভাবে ছোট। সে সময় প্রেস ক্লাবের সদস্য সংখ্যাও ছিল প্রায় ৫০ জনের মতো। তবে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রেস ক্লাবের সদস্য সংখ্যা এবং কর্মকাণ্ডও দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৬১ সালে সাংবাদিকদের প্রথম ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষণার পর সংবাদপত্র শিল্প ও সাংবাদিক সমাজের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়। এর প্রভাব পড়ে প্রেস ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও।
পুরনো প্রেস ক্লাব ভবন ও ১৯৭১ সালের ক্ষতচিহ্ন
১৯৫৪ সালে যে লাল ভবনে প্রেস ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই ভবন আজ আর নেই। কিন্তু ভবনটির স্মৃতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনার সময় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৎকালীন ভবনেও হামলা চালায়। মর্টারশেলের আঘাতে ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সেই সময়ের ক্ষতচিহ্ন জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাব
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রেস ক্লাব নতুন পরিচয়ে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭২ সালের ৫ মার্চ তৎকালীন সভাপতি আবদুল আউয়াল খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব’র পরিবর্তে ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব’ নাম রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের এই প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব’ নামে নতুন পরিচয় লাভ করে।
স্থান পরিবর্তন বিতর্ক ও স্থায়ী জায়গা বরাদ্দ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী জায়গা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন আলোচনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলছিল। তোপখানা রোড এলাকায় তোপখানা রোডের এই জমিটি পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্লাবের তৎকালীন সাংবাদিক নেতারা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ মুজিব সচিবালয় সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে প্রেস ক্লাবকে বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করেন এবং এর পরিবর্তে শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন এক একর জমি বরাদ্দের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ক্লাবের সদস্য ও সাংবাদিক নেতারা স্থান পরিবর্তনে রাজি না হয়ে তীব্র আপত্তি জানান, যার ফলে শেখ মুজিবের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকারের পতন হলে প্রেস ক্লাবের বর্তমান জায়গাটিই বহাল থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকার সাংবাদিকদের যৌক্তিক দাবির মুখে সেগুনবাগিচার এই ঐতিহাসিক জায়গাটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়। এর মাধ্যমেই প্রেস ক্লাব তার কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী ঠিকানা লাভ করে এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পথ উন্মুক্ত হয়।
নতুন ভবন নির্মাণ ও শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান ভবনের ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান জায়গাটি বরাদ্দ দেয়। এর ফলে প্রেস ক্লাব একটি স্থায়ী ঠিকানা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ লাভ করে। এই সময় আগা খান সম্প্রদায়ের প্রধান ঢাকায় সফরে এসে জাতীয় প্রেস ক্লাব পরিদর্শন করেন। প্রেস ক্লাবের উন্নয়ন ও নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ১০ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেন। আগা খানের এই উদ্যোগের খবর তৎকালীন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নজরে আসে। বিষয়টি জানার পর তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রেস ক্লাবের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয়ভারও সরকার বহন করে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান অবকাঠামোগত ইতিহাসে তাই ১৯৭৭ সালে বর্তমান জায়গা বরাদ্দ, আগা খানের পক্ষ থেকে নতুন ভবন নির্মাণে সহযোগিতার ঘোষণা এবং ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন— এই ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় প্রেস ক্লাব পুনর্গঠন ও উন্নয়নে খালেদা জিয়ার অবদান
জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়িত্ব ও আধুনিকায়নে তিন বারের সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদান অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক। ২০০৪ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সুবর্ণ জয়ন্তী (৫০ বছর) উদযাপনকালে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রেস ক্লাবের স্থায়ী জমির পরিধি বৃদ্ধি করে মোট দুই একর জমি মাত্র ১০১ টাকার বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য স্থায়ী লিজ ঘোষণা করেন এবং একই সঙ্গে ক্লাবের নতুন বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ ছাড়াও তিনি অত্যন্ত নামমাত্র মূল্যে ক্লাবের জমির সাবকবলা দলিল রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ করে দেন। খালেদা জিয়া সময় পেলেই প্রেস ক্লাবের নানা অনুষ্ঠানে এসে ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে কুশল ও মতবিনিময় করতেন। ক্লাবের সার্বিক উন্নয়ন, কল্যাণ এবং সাংবাদিকদের সহায়তায় তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তা জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মিরপুরে সাংবাদিক কলোনি বরাদ্দ ও সাংবাদিকদের কল্যাণে অবদান
১৯৭৯ সালে মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট শহিদ জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম, সাংবাদিকদের আবাসন ও সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে ২০ একর জমি বরাদ্দ প্রদান করেন, যা পরবর্তী সময়ে ‘সাংবাদিক কলোনি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে আপসহীন দেশনেত্রী ও প্রয়াত সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতি’র নামে সাংবাদিকদের কল্যাণে মিরপুর-১২ নম্বর সেক্টরে আরো প্রায় ২১ একর জমি সাবকবলা রেজিস্টৃ করে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেন। উক্ত জমিতে বর্তমানে সাংবাদিকদের আধুনিক আবাসন প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্থায়ী বাসস্থান ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অবদান দেশের সাংবাদিক সমাজ চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।
সাংবাদিক কল্যাণ ও জাতীয় প্রেস ক্লাব গঠনে দেশনায়ক তারেক রহমানের অবদান ও প্রত্যাশা
ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৭ বছরের শাসনকালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান চরম রাজনৈতিক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। গত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট সরকার জিয়া পরিবারের ওপর সব চেয়ে বেশি জেল জুলুম ও নির্যাতন করেছেন ও শ্লোপয়জনিং প্রয়োগে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার দুই সন্তানকেও জেল জুলুম ও নির্যাতন করেছে। তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত থেকেও তিনি দলকে সুসংগঠিত রাখেন এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল রূপকার হিসেবে দূর থেকেই আন্দোলন পরিচালনা ও সফল নেতৃত্ব প্রদান করেন। ২০২৫ সালে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ২০২৬ সালের পার্লামেন্ট ইলেকশনে বিপুল জনমতের ভিত্তিতে তার নেতৃত্বেই সরকার গঠিত হয়। প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাত মাসের সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের জন্য স্থায়ী পেনশনের উদ্যোগ এবং সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান আগামীতে আরো চার গুণ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া তারই নির্দেশনায় চলমান রয়েছে। বর্তমানে দেশের সাংবাদিক সমাজ তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছেন এবং গণমাধ্যমের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
সম্প্রতি তার মায়ের খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতাদের সঙ্গে শোকবাণী হস্তান্তর ও এক ফলপ্রসূ সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। আগামীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে তাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর লক্ষ্যে ক্লাব কর্তৃপক্ষের একটি উপকমিটি গঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ভাবেই জিয়া পরিবারের তিন জন সরকার প্রধানই জাতীয় প্রেস ক্লাবের উন্নয়ন ও সাংবাদিকদের কল্যাণে অসামান্য ভূমিকা রেখে ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন। আমরা তার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সুদূরপ্রসারী সাফল্য কামনা করি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ২০০৪ সালে সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া যে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। খালেদা জিয়ার এই অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার জিয়া পরিবারের প্রতিহিংসার কারণে এই মেট্রো রেল স্টেশন নামটি সচিবালয় রাখেন। আমারা আশা করি জাতীয় প্রেস ক্লাব সংলগ্ন স্টেশনটির নাম ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব স্টেশন’ রাখার জন্য বর্তমান প্রধান মন্ত্রী ও সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।
সদস্য ও পরিচালনা কাঠামো
জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান হলেও সময়ের সঙ্গে এর সাংগঠনিক কাঠামোও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে আজীবন সদস্য, পেশাদার সাংবাদিকদের স্থায়ী সদস্য এবং সহযোগী সদস্য— এই তিন ধরনের সদস্য পদের কথা বলা হয়। সহযোগী সদস্যদের ভোটাধিকার নেই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৮০০ এবং ক্লাব পরিচালনা কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৭ জন। সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় প্রেস ক্লাবও দেশের সাংবাদিক সমাজের একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের মিলনস্থল
জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশি-বিদেশি বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এখানে এসেছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন। সাংবাদিকদের পাশাপাশি লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিক, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদেরও প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। প্রেস ক্লাবের পুরনো দিনের স্মৃতিচারণে দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আগমনের কথা পাওয়া যায়। লেখক, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্যও প্রেস ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত।
জাতীয় আন্দোলন ও সংগ্রামে প্রেস ক্লাব
জাতীয় প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের একটি প্রফেশনাল ক্লাব হলেও প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বিভিন্ন জাতীয় ইসুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৬০-এর দশক থেকেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইসুতে প্রেস ক্লাব কেন্দ্রিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৬২ সালে প্রেস ও পাবলিকেশনস এক্টের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে ঐতিহাসিক মিছিল বের হয়েছিল। একই সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে শান্তি মিছিলের উদ্যোগও প্রেস ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে প্রেস ক্লাবের পুরনো সদস্যদের স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা বিরোধী শান্তি মিছিল এবং ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রতিবাদ মিছিলসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির সঙ্গেও প্রেস ক্লাবের নাম জড়িয়ে আছে। পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা এবং স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল ও কর্মসূচির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
নব্বই ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে প্রেস ক্লাবের ভূমিকা
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে নব্বইয়ের দশকের শুরু একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় জাতীয় প্রেস ক্লাব সাংবাদিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রেস ক্লাবের ভেতরে-বাইরে বিভিন্ন দল, মত ও পেশার মানুষ তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন। জাতীয় ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ এ প্রেস ক্লাবকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আন্দোলন সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ, সংবাদ সম্মেলন, সমাবেশ, মানব বন্ধন, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই জাতীয় প্রেস ক্লাবকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্রের তীর্থভূমি হিসেবে দেখা হয়।
সাম্প্রতিক সময়েও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভূমিকা শুধু অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন জাতীয় ইসুতে সাংবাদিক, পেশাজীবী, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এখানে সভা, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় করেছে। গত ১৫ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আলোচনা জাতীয় প্রেস ক্লাবকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সময়ের ঘটনাবলি ও প্রেস ক্লাবের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন থাকলেও, একটি বিষয় স্পষ্ট— জাতীয় প্রেস ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত পরিসর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক
জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত মিলন কেন্দ্র নয়; বরং দেশের বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের মতপ্রকাশের একটি পরিচিত স্থান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক উদ্যোগ ও আন্দোলনকারী গোষ্ঠী এখানে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেছে। অনেক জাতীয় সংকটের সময়ে প্রেস ক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, পেশাজীবী ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অবস্থান নিয়েছেন। এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে জাতীয় প্রেস ক্লাব বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের দীর্ঘ পথচলা
১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর একটি সীমিত পরিসরের সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তা আজ দেশের সাংবাদিক সমাজের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পুরনো লাল ভবন থেকে বর্তমান আধুনিক অবকাঠামো, সীমিত সদস্য সংখ্যা থেকে বৃহৎ সদস্য সমাজ এবং পেশাগত ক্লাব থেকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মতপ্রকাশের কেন্দ্রে পরিণত হওয়া— জাতীয় প্রেস ক্লাবের এই পথচলা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৫৪ সালের প্রতিষ্ঠা, ১৯৭১ সালের ধ্বংসযজ্ঞ, ১৯৭২ সালে নতুন নাম, ১৯৭৭ সালে বর্তমান জায়গা বরাদ্দ এবং ১৯৭৯ সালে নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নব্বই ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে প্রেস ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে প্রত্যাশা
জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস স্মরণ করারও একটি দিন। যে প্রতিষ্ঠান ১৯৫৪ সালে মাত্র কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের সাংবাদিক সমাজের একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনেও জাতীয় প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের একটি শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে— এটাই প্রত্যাশা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রতিষ্ঠান শুধু তার ভবন দিয়ে বড় হয় না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের কর্ম, সংগ্রাম, স্মৃতি ও জাতীয় জীবনে তার ভূমিকার মধ্য দিয়েই একটি প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করে। জাতীয় প্রেস ক্লাব তাই শুধু একটি ভবনের নাম নয়— এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ পথচলার একটি জীবন্ত স্মারক।
২০ অক্টোবর ২০২৬ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সব সদস্য, সাংবাদিক, গণমাধ্যম কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
এ কে এম মহসীন : সভাপতি বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন, সহ-সভাপতি বিএফইউজে, নির্বাহী সদস্য জাতীয় প্রেস ক্লাব