একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। তার মৃত্যুর পর মরদেহ দাফন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন নিয়ে পিরোজপুরে তৈরি হয় বিতর্ক। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মীদের আপত্তির মুখে দাফন ও গার্ড অফ অনার নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। পরে প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় শনিবার গভীর রাতে দাফন সম্পন্ন হয় ৮৭ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধার।
পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানিক পশারী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত ও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। শনিবার দুপুরে তার মরদেহ পিরোজপুরে নেয়া হলে দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন নিয়ে জটিলতা দেখা দেয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
স্বজনদের ভাষ্য, মরদেহটি সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেয়া হলে সেখানে উপস্থিত স্থানীয় জামায়াত নেতা-কর্মীরা গার্ড অফ অনার দেয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান। মানিক পশারী সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী ছিলেন— এ কারণে তার দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে বাধা দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন পরিবারের সদস্যরা।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে পুলিশ মরদেহটি জেলা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রশাসনের উদ্যোগে গার্ড অফ অনার দেয়া হয়। পরে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশের সহায়তায় মরদেহ চিতলিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌছায়। রাত ২টার দিকে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে তারা মরদেহ পিরোজপুরে এনে দাফনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় বাড়িতে মরদেহ নিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
পিরোজপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানান, গার্ড অফ অনার দেয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়নি। কিছু সময় পুলিশি হেফাজতে রাখার পর পরিবারের কাছে মরদেহ পৌছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
তবে দাফনে বাধা দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, মানিক পশারীর দাফনে জেলা জামায়াত বা অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতা-কর্মী বাধা দেয়নি। জামায়াতে ইসলামী লাশের রাজনীতি করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, সদর থানা পুলিশকে সহযোগিতা করেই দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
পিরোজপুর-১ আসনের এমপি ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সোশাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টে বলেন, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য বা আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল এক জন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে’ গার্ড অফ অনার দেয়া নিয়ে। তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে গোপনে গার্ড অফ অনার দেয়ার অভিযোগও তোলেন।
মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে দায়ের করা মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে ট্রাইবুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আপিলে সাজা কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট জেল হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি ছিলেন। বর্তমানে ওই আসনের এমপি তার ছেলে মাসুদ সাঈদী।