মোটর বাইকের সামনে নাম্বার প্লেট বসাতে ভোগান্তি চরমে

শেষ পাতা

* ১৫ নভেম্বরের ডেডলাইনে দিশাহারা চালকরা, অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে অসাধু চক্র* ৯৫ শতাংশ মোটর সাইকেলের সামনের অংশে ফ্যাক্টরি থেকে নাম্বার

2026-10-26T00:00:00+06:00
2026-10-26T17:18:27+06:00
মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২৬
১১ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
শেষ পাতা
মোটর বাইকের সামনে নাম্বার প্লেট বসাতে ভোগান্তি চরমে
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৬.১০.২০২৬ ৫:১৮ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
* ১৫ নভেম্বরের ডেডলাইনে দিশাহারা চালকরা, অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে অসাধু চক্র
* ৯৫ শতাংশ মোটর সাইকেলের সামনের অংশে ফ্যাক্টরি থেকে নাম্বার প্লেট বসানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই
* নির্দেশনা না মানলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ শাস্তি
* গণভোগান্তি-নির্দেশনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে আইনজীবীরা

এম এইচ সৈকত
রাজধানীসহ সারা দেশে দিন দিন বাড়ছে মোটর সাইকেলের সংখ্যা। বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ নিবন্ধিত মোটর সাইকেল রয়েছে। অনেকেরই এই বাহন দিয়ে চলছে সংসার। এতে কমেছে অনেক বেকারত্ব। তবে এই বাহনের দুর্ঘটনাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। একই সঙ্গে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মোটর সাইকেলের সামনে ম্যানুয়াল নাম্বার প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে। বিআরটিএ’র দাবি, অপরাধী বা ট্রাফিক আইন অমান্যকারীকে দ্রুত শনাক্ত করতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে মোটর সাইকেল চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
চালকদের দাবি, আধুনিক কোনো বাইকের সামনে নাম্বার প্লেট বসানোর মতো নির্দিষ্ট কোনো জায়গা বা মাউন্টিং পয়েন্ট তৈরি করে না। নিজেরা বানিয়ে লাগাতে গেলে মাপের ভুল বা নকশার তারতম্যের কারণে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হবে কি না, তা নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা আরো বলেন, ‘সময় একেবারে কম দেয়া হয়েছে। ১৫ নভেম্বর ডেডলাইনের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দিয়েও নাম্বার প্লেট মিলছে না। আবার বিআরটিএর একেক সময় একেক সিদ্ধান্ত নেয়ায় কোনো ফলস্বরূপ না হলেও চালকের হয়রানির শেষ নেই। প্রথম ডিজিটাল নাম্বার প্লেট নিয়ে টালবাহানা, এরপর নতুন করে সামনের ম্যানুয়াল নাম্বার প্লেট। অথচ ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের জন্য গ্রাহকের টাকা নেয়া হলেও সেবার খাতার শূন্য। শুধু নামেই ডিজিটাল, কাজে আসে না।

অন্যদিকে বিআরটিএ বলছে, রাস্তায় চলাচলকারী মোটরসাইকেলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমন, ছিনতাই প্রতিরোধ এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট রিডিং সহজ করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত বজায় রাখা হয়েছে। ট্রাফিক নজরদারি ও সড়ক শৃঙ্খলা জোরদার করতে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ডেডলাইন দেয়া হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আর্থিক শোষণের চেয়েও বড় বিড়ম্বনা হয়ে দাড়িয়েছে বাইকের প্রযুক্তিগত ও গাঠনিক ডিজাইন জটিলতা। বাজারে থাকা নতুন ও পুরনো প্রায় ৯৫ শতাংশ মোটরসাইকেলের সামনের অংশে ফ্যাক্টরি থেকে নাম্বার প্লেট বসানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গা বা ব্র্যাকেট ক্র্যাডল তৈরি করা থাকে না। ফলে স্পোর্টস বাইক, ক্রুজার কিংবা সাধারণ কমিউটার বাইকের উইন্ডশিল্ড, হেডলাইটের ওপরের অংশ বা মাডগার্ডের সঙ্গে এক্সট্রা ক্ল্যাম্প বা কাস্টমাইজড নাট-বোল্ট দিয়ে জোরপূর্বক এই লোহার প্লেট ঝোলানো হচ্ছে। এতে বাইকের রেডিয়েটরের বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে ইঞ্জিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হচ্ছে এবং হেডলাইটের আলো আংশিক ঢেকে যাওয়ায় রাতে চলাচলের ক্ষেত্রে চালকদের দৃষ্টিসীমা ব্যাহত হচ্ছে।

এভিয়েশন ও মেকানিকাল বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইকের সামনের অংশে কোনো ধরনের যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষা ও এয়ারোডাইনামিক ট্রায়াল ছাড়াই এই মেটাল প্লেট ঝুলিয়ে দেয়া চরম বিপজ্জনক। তীব্র বাতাসের চাপ ও ইঞ্জিনের উচ্চ কম্পনের কারণে যে কোনো সময় এই ধারালো লোহার প্লেটটি ছুটে গিয়ে চাকার ভেতর ঢুকে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি এর ধারালো প্রান্ত পথচারী বা সহযাত্রীর শরীরে লেগে গুরুতর জখম হওয়ার ঝুকিও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না, যা রাইডারদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ইউনিভার্সিটির দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘অতিরিক্ত নাম্বার প্লেট লাগানোর চেয়ে বিআরটিএ-এর ২০১২ সাল থেকে সরবরাহ করা আরএফআইডি সিস্টেমকে সক্রিয় করা বেশি টেকসই সমাধান হতো। কুয়াশা বা কম আলোতে এআই ক্যামেরাও সামনের প্লেট শনাক্ত করতে সমস্যা বোধ করতে পারে।’

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় নাম্বার প্লেট লাগাতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রাকিব হাসান তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিআরটিএর এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ একগুয়েমি এবং বাস্তবতাবর্জিত। বাইকের সামনে প্লেট বসানোর কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা কম্পানি থেকে দেয়া হয় না। জোর করে মাডগার্ডে নাট মারতে গিয়ে নতুনের মতো বাইকের বডি ডৃল করে নষ্ট করতে হচ্ছে। তার ওপর ডেডলাইনের ভয় দেখিয়ে ওয়েল্ডিং ও মেকানিক শপের কারিগররা ইচ্ছামতো টাকা চাচ্ছে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাইকারদের ওপর এক ধরনের জুলুম ছাড়া আর কিছুই নয়।’

এদিকে বিআরটিএর এই নির্দেশনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সরব সোশাল মিডিয়া। কেউ কেউ গলায় নাম্বার প্লেট ঝুলিয়ে আবার অনেকে মোটরসাইকেলের নাম্বারের জামা-কাপড় বানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। অনেকে আবার নিজের ফেসুবকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মাসুদ নামের এক জন ফেসবুকে লিখেছে, বাইকারদের জন্য যত আইন। অথচ রাস্তায় নামলে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির বিষয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুর, বংশাল, খিলগাঁও এলাকাসহ সারা দেশের নাম্বার প্লেট তৈরির দোকানগুলোতে তীব্র ভিড় তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও কারিগরদের সিন্ডিকেট সাধারণ চালকদের কাছ থেকে তিন-চার গুণ পর্যন্ত বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।

তবে বিআরটিএ বলছে, দোকানদারদের বাড়তি টাকা নিলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বাজার তদারকি করে অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ১৫ নভেম্বরের সময়সীমা কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না এবং নির্ধারিত সময়ের পর সামনের প্লেট ছাড়া কোনো মোটরবাইক রাস্তায় মিললে ট্রাফিক আইনের কঠোর ধারায় মামলা ও ভারী জরিমানা করা হবে বলে তারা পরিষ্কার সতর্ক বার্তা দিয়েছে। 

বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের যে এআই ক্যামেরা বা ট্রাফিক পুলিশিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেলের পেছনের নাম্বার প্লেট দেখে অনেক সময় অপরাধী বা ট্রাফিক আইন অমান্যকারীকে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এই কারিগরি জটিলতা দূর করতে এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই মোটরসাইকেলের সামনেও নাম্বার প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব মোটরসাইকেল মালিককে নিজ দায়িত্বে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত পরিমাপ ও নকশা মেনে এই প্লেট স্থাপন করতে হবে। নির্দিষ্ট এই সময়সীমার মধ্যে যারা এই নির্দেশ অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

ট্রাফিক পুলিশ বলছে, ‘এটা বিআরটিএর বিষয়। তারা যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটা না মানলে আইনগত যে ব্যবস্থা রয়েছে তা বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।’

এদিকে বিআরটিএর গণভোগান্তি ও নির্দেশনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সুপৃম কোর্টের কয়েক জন আইনজীবী। তারা জানান, বিআরটিএর এই গণবিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অটোমোবাইল স্ট্যান্ডার্ড এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন পলিসি লঙ্ঘন করে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত রাইডারদের জানমালের জন্য বড় হুমকি। বিআরটিএ যেখানে নিজস্ব ডিজিটাল প্লেট সঠিক সময়ে সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে চালকদের লোকাল দোকান থেকে নিম্নমানের লোহার পাত বানিয়ে লাগাতে বাধ্য করা কোনো সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না।

বিআরটিএর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের পেছনে সরকারি স্মার্ট আরএফআইডি ধাতব প্লেট থাকার পাশাপাশি এখন সামনের অংশেও স্টেইনলেস স্টিল বা এলুমিনিয়ামের তৈরি সাদা পটভূমির ওপর কালো রঙের বাংলা অক্ষরে ম্যানুয়াল নাম্বার প্লেট প্রদর্শন করতে হবে। সাধারণ মোটরসাইকেলের জন্য এই প্লেটের সাইজ ২৮৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০ মিলিমিটার প্রস্থ এবং স্কুটারের জন্য ২০০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ও ১০০ মিলিমিটার প্রস্থ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে অক্ষরের উচ্চতা হতে হবে সর্বনিম্ন ২০ মিলিমিটার। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই প্লেট চালকদের নিজস্ব খরচে তৈরি করে নিতে হচ্ছে, যা বাজারে মাত্র ১৫০-২০০ টাকায় তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও ডেডলাইনের চাপের মুখে কারিগরি অসাধু চক্র ৫০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে।

শেষ পাতা- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত