নৌকাবাইচ দেখতে নদীপাড়ে মানুষের ঢল

পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

সারাদেশ

কারও কাছে শৈশবের স্মৃতি, কারও কাছে নতুন অভিজ্ঞতা, আবার কারও কাছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।

2026-10-02T14:17:58+06:00
2026-10-02T14:17:58+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
নৌকাবাইচ দেখতে নদীপাড়ে মানুষের ঢল
পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১৭ পিএম  
ছবি-যাযাদি
কারও কাছে শৈশবের স্মৃতি, কারও কাছে নতুন অভিজ্ঞতা, আবার কারও কাছে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। একই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়েছিলেন কয়েক প্রজন্মের মানুষ। উপলক্ষ ছিল নৌকাবাইচ। তবে দক্ষিণ চরটেকীর ব্রহ্মপুত্রপাড়ে বৃহস্পতিবারের আয়োজন শুধু নৌকার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; হয়ে উঠেছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের, অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক আনন্দময় মিলনমেলা।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার দক্ষিণ চরটেকী এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদে ১ অক্টোবর বিকেলে দেখা যায় এমন দৃশ্য। স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন এ আয়োজন উপভোগ করতে।

কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে যোগ দিয়েছেন উৎসবে। শিশুদের কাছে নৌকাবাইচ ছিল রোমাঞ্চের, তরুণদের কাছে আনন্দের, আর প্রবীণদের কাছে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে দেখার উপলক্ষ।

নদীর বুকে একের পর এক নৌকা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শকদের উত্তেজনা। মাঝিদের বৈঠা চালানোর গতি, নৌকাগুলোর পাল্লাপাল্লি আর পাড়জুড়ে মানুষের উচ্ছ্বাসে বিকেলের নিরিবিলি পরিবেশ বদলে যায় উৎসবের রূপে।

প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে আটটি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে কটিয়াদী উপজেলার করগাঁওয়ের দুলাল চেয়ারম্যানের নৌকা। একই এলাকার হাবিবুর রহমান জালাল মিয়ার নৌকা দ্বিতীয় এবং পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়া এলাকার ইসমাইলের নৌকা তৃতীয় হয়।

বিজয়ী দলগুলোর জন্য রাখা হয় আকর্ষণীয় পুরস্কার। প্রথম স্থান অর্জনকারী দলকে দেওয়া হয় একটি মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে একটি রেফ্রিজারেটর এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে একটি এলইডি টেলিভিশন। অন্য দলগুলোও পায় সান্ত্বনা পুরস্কার।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। নৌকাবাইচের উদ্বোধন করেন পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস।

উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ভিপি মো. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান, উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তৌফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মাসুদ এবং পৌর বিএনপির সভাপতি এসএএম মিনহাজ উদ্দিন।

মঙ্গলবাড়িয়া এলাকা থেকে আসা নওশাদ আলম বাপ্পীর কাছে এবারের নৌকাবাইচ ছিল বিশেষ আনন্দের। যে এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা, সেই এলাকার পরিচিত পরিবেশে এবার তিনি ফিরেছেন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে।

নওশাদ বলেন, ‘এখানে আমার ফুফুর বাড়ি। আমি এখানেই বড় হয়েছি। নৌকাবাইচ অনেক উপভোগ করেছি। এবার সন্তানকে নিয়ে আবারও দেখতে এসেছি। খুব ভালো লাগছে।’

গফরগাঁও উপজেলার দত্তের বাজার এলাকা থেকে আসা সবেদ আলীও নৌকাবাইচ দেখতে ছুটে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি। অনেক মানুষের ভিড়। অনেক দিন পর নৌকাবাইচ উপভোগ করতে পেরে খুবই আনন্দিত।’

অন্যদিকে বাহাদিয়া এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ নিজাম উদ্দিনের কাছে এ আয়োজনের গুরুত্ব কিছুটা ভিন্ন। একসময় গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত নৌকাবাইচ হওয়ার স্মৃতি তাঁর মনে এখনো অমলিন। তিনি বলেন, ‘একসময় প্রচুর নৌকাবাইচ হতো। এখন অনেকটাই কমে গেছে। লোকমুখে শুনে এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি।’

আয়োজক কমিটির পক্ষে কুতুব উদ্দিন কিরণ বলেন, নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। গ্রামের মানুষকে বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। হাজারো মানুষ নদীর পাড়ে এসে নৌকাবাইচ উপভোগ করেছেন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ আয়োজন করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের।

দিন শেষে প্রতিযোগিতার ফলাফল হয়তো নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের নাম মনে রাখবে। কিন্তু নদীর দুই পাড়ে যাঁরা একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন, তাঁদের কাছে দিনটি হয়ে থাকবে মিলন ও স্মৃতির এক উপলক্ষ হিসেবে।

ব্রহ্মপুত্রের জল প্রতিদিনই বয়ে যায়। কিন্তু সেই জলের বুকে নৌকাবাইচকে ঘিরে মানুষের এমন সমাগম প্রতিদিন দেখা যায় না। দক্ষিণ চরটেকীর এ আয়োজন তাই শুধু একটি দিনের বিনোদন নয়, গ্রামীণ জনজীবনে লোকজ সংস্কৃতির আবেদন এখনো কতটা গভীর, তারও একটি প্রতিচ্ছবি।
  বিষয়:   নৌকাবাইচ  নদীপাড়  মানুষ 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত